মাধবপুরে আমন মৌসুমে সারের জন্য কৃষকের হাহাকার

সংগৃহীত ছবি
ধানের জমিতে সার দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় এখন। অথচ প্রয়োজনমতো সার না পেয়ে ডিলারের দোকানে দোকানে ঘুরছেন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার কৃষকরা। কেউ পাচ্ছেন ১০ থেকে ১২ কেজি, কেউ ফিরছেন খালি হাতে। আবার খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে— এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে সময়মতো জমিতে সার দিতে না পারায় ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
চলতি আমন মৌসুমে ধানের চারা রোপণের পর দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হয়েছে। আগস্ট জুড়েও ছিল বৃষ্টির প্রভাব। অনেক কৃষক জমিতে সার প্রয়োগ করলেও বৃষ্টির পানিতে তা ধুয়ে যাওয়ায় পুনরায় সার দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এমন সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় আমন চাষের খরচ ও ফসল নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
ছাতিয়াইন ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামের কৃষক দিলু মিয়া, আশরাফ উদ্দিন ও নুরুল আমিন অভিযোগ করেন, ডিলারের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ কেজি সার দেওয়া হচ্ছে।
দিলু মিয়া চলতি মৌসুমে ১২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তার হিসাবে প্রতি বিঘায় এক বস্তা টিএসপি, ২০ কেজি ইউরিয়া ও এক বস্তা বেঙ্গল সার প্রয়োজন। কিন্তু ডিলারের কাছে চাহিদা নিয়ে গেলে ১০ থেকে ১২ কেজির বেশি সার দিতে রাজি হননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। সময়মতো সার না পাওয়ায় তার জমিগুলো নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তার অভিযোগ, ১ হাজার ৩৫০ টাকার বস্তা সার রাতে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হচ্ছে।
একই গ্রামের আসাউদ্দিন বললেন, ডিলারের কাছে গিয়েও সার না পেয়ে খুচরা দোকান থেকে কেজিপ্রতি ৩৫ টাকা দরে সার কিনতে হয়েছে।
নুরুল আমিন আড়াই বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, সার পাওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও প্রয়োজনীয় সার পাননি। এক খুচরা দোকানদার তাকে বস্তা রেখে যেতে বলেন। পরে লোকজন চলে গেলে সার দেওয়া হবে জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে মাত্র ১৫ কেজি সার দেওয়া হয়। তার প্রশ্ন, টাকা দিয়েও কেন প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাবে না? ছাতিয়াইন গ্রামের কৃষক বাবুল খান বলেন, সার না পাওয়ায় তার প্রায় ১০ বিঘা জমি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কৃষক পর্যায়ে ৫০ কেজির বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, এমওপি ১ হাজার এবং ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারিত। কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে কোথাও ইউরিয়া ২ হাজার ১০০, টিএসপি ১ হাজার ৬৫০, ডিএপি ১ হাজার ৫৫০ ও এমওপি ১ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউরিয়া ২ হাজার, টিএসপি ১ হাজার ৮৫০, ডিএপি ১ হাজার ৭৫০ ও এমওপি ১ হাজার ২৫০ টাকা দরে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
নোয়াপাড়া ইউনিয়নের রতনপুর বাজারের খুচরা বিক্রেতা সাহ আলম আগামীর সময়কে বললেন, ‘ডিলারের কাছে গেলে বলে সার নেই। বেশি দাম দিলে আবার তার কাছেই সার মিলে।’
তবে ছাতিয়াইন ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিসিআইসি ডিলার চন্দন পাল আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সার সংকট নেই। চলতি মাসের বরাদ্দের উত্তোলনকৃত সার শেষ হয়ে গেছে। দুইজনকে এক বস্তা করে দিয়েছি।’
কৃষকদের ১০ থেকে ১২ কেজি করে সার দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন চন্দন পাল। তিনি জানান, আগামী মাসের সার ২৫ সেপ্টেম্বর উত্তোলন করার কথা রয়েছে। ওই সার উত্তোলন করা হলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে মাধবপুরে ১২ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। আবাদি জমির হিসাব অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিসিআইসি ডিলাররা উত্তোলন করা সারের ৫০ শতাংশ সাব-ডিলারদের কাছে এবং বাকি ৫০ শতাংশ খুচরা বাজারে বিক্রি করেন।
কৃষি অফিসের দাবি, আমন আবাদ অনুযায়ী উপজেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে।
ছাতিয়াইন ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেন, ‘সার সংকট নেই। সব কৃষক একসঙ্গে ডিলারের দোকানে আসায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। আগামী মাসে সমস্যা আর থাকবে না।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজিব সরকার বলেছেন, ‘সার সংকট নিয়ে একটি গুজব চলছে। ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। গুজবের কারণে কৃষকরা চাহিদার দ্বিগুণ সার চাইছেন। চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ায় সংকটের গুজব ছড়াচ্ছে।’ তবে ডিলারদের বিরুদ্ধে কালোবাজারে সার বিক্রির অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান আগামীর সময়কে বলেন, ‘সার সংকটের বিষয়টি কেউ জানায়নি। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দ আগাম উত্তোলনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং অক্টোবরের জন্যও সারের মাসিক বরাদ্দ প্রকাশ করা হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, বরাদ্দ ও মজুদের হিসাব থাকলেই হবে না, আমন ধানের প্রয়োজনের সময়ে সেই সার কৃষকের হাতে পৌঁছাতে হবে। কারণ সময়মতো সার না পেলে পরে সার পাওয়া গেলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই দ্রুত সার সরবরাহ নিশ্চিত, নির্ধারিত দামে বিক্রি এবং বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।



