ইউএনওর পথ আটকে ‘ঘুষ’ ফেরত চেয়ে নারীর ফেসবুক লাইভ

তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়— সংগৃহীত
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরুর পথ আটকে ছেলের চাকরির জন্য দেওয়া ঘুষের টাকা ফেরত চেয়েছেন এক নারী। এ সময় ঘটনাটি নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভ করেন তিনি। গত সোমবার দুপুরের পর তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে ঘটেছে এ ঘটনা।
ওই দিন সন্ধ্যায় ঘুষের টাকা ফেরত চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন তেঁতুলিয়া সদর ইউনিয়নের মাগুরা এলাকার বাসিন্দা রেহেনা বেগম (উর্মি)। তবে অভিযোগের তদন্তে সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে এটিকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন ইউএনও।
লিখিত অভিযোগে রেহেনা বেগম দাবি করেন, তার ছেলেকে গ্রাম পুলিশের চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিয়েছেন। পরে সেই টাকা ফেরত চাইলে তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়।
ওই নারীরে ফেসবুক লাইভে দেখা যায়, ‘নিজের কার্যালয় থেকে বের হয়ে গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন ইউএনও। এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাইভ করতে করতে ওই নারী বলেছেন, ‘আপনি চাকরি দিতে চাইছেন, এখন মিথ্যা কথা বলিয়েন না।’ ইউএনওর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্য এগিয়ে এলে তিনি বলেন, ‘আপনি ফোন নিচ্ছেন কেন? ফোন নিবেন না। না হলে কিন্তু সমস্যা হবে, আমি গরিব লোক।’
এরপর ইউএনও বলেছেন, ‘কত টাকা দিছেন?’ জবাবে ওই নারী বলেছেন, ‘১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিছি আপনাকে।’ ইউএনও জানতে চান, ‘কোন জায়গায় দিছেন?’ তখন ওই নারী বলেন, ‘আপনার অফিসে দিছি ছয় মাস আগে। তখন ডিসেম্বর মাস। তিন মাস আগেও তো আমি আপনার অফিসে আসছি স্যার, আপনি এ রকম কেন শুরু করছেন?’
এর জবাবে ইউএনও বলেছেন, ‘আপনাকে তো আমি চিনি না। আপনার ছেলে কে? তাই তো চিনি না। আপনাকে সিনক্রিয়েট করতে পাঠায় দিল আর আপনি এসে নকশা করতেছেন এই জায়গায়?’ তখন ওই নারী বলেছেন, ‘আমি আপনার সঙ্গে নকশা করব কেন, বলেন। আপনি আমার টাকাটা দিয়ে দেন স্যার। আপনি আমাকে জেলে দেন, ফাঁসি দেন, যা-ই দেন, আমার টাকাটা লাগবে। আজকে আমি তিন দিন ধরে ঘুমাতে পারি না। আপনি ট্রান্সফার হবেন।’ পরে তিনি পাশের একজনকে বলেন, ‘দেখত ভাইয়া লাইভটা হইছে না? এখন কাটব কেমনে বলেন? আমি এখন ডিসির কাছে যাব।’
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তেঁতুলিয়াসহ জেলা জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার ইউএনওর সমর্থনে দুই দফা মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ‘বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের’ ব্যানারে এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলা শহরের তেঁতুলতলায় ‘উপজেলার সর্বস্তরের জনসাধারণ’ ব্যানারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে ইউএনওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ এবং ওই নারীসহ সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
মঙ্গলবার বিকালে রেহেনা বেগমের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রতিবেশী বললেন, ‘ওনার ছেলের গ্রাম পুলিশের চাকরি কীভাবে হবে? এটা করতে গেলে তো অন্তত অষ্টম শ্রেণি পাস করতে হবে। ওনার ছেলে তো পড়াশোনা জানে না। তাছাড়া গ্রাম পুলিশের চাকরির জন্য একসঙ্গে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা কোথা থেকে পেলেন? আমাদের মনে হচ্ছে, এটা কোনো ষড়যন্ত্র হতে পারে।’
রেহেনা বেগম মোবাইল ফোনে বলেছেন, ‘আমার ছেলে লেখাপড়া তেমন একটা করে নাই। আমি ছয় মাস আগে ইউএনও স্যারকে গিয়ে বলছি যে স্যার আমরা গরিব মানুষ, একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেন। তখন উনি চৌকিদারের চাকরি দেওয়ার কথা বলেন। এ জন্য প্রথমে ৫ লাখ চাইলেও পরে ৩ লাখের কথা বলেন। পরে আমি আমার মায়ের জমি বেইচা ১ লাখ আর আমরা কিছু দিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিছি। উনি ট্রান্সফার হবেন শুনে আমি ওখানে গেছি।’
তিনি আরও বললেন, ‘আমি যে ডিসি অফিসে অভিযোগ দিয়েছি, এটার বিষয়ে মঙ্গলবার আমাকে ডিসি অফিসে ডেকে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা তদন্তের জন্য জেরা করেছে। আমি ওই দিন থেকে বাড়িতে যেতে পারছি না। ওখানে আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করাচ্ছে। আবার সোমবার আমার ছোট ছেলেকে এবং আমি যার সঙ্গে পেজের জন্য ড্যান্স করি ওই ছেলেকে তুলে নিয়ে গেছে। পরে আবার তাদের ছেড়ে দিছে। আমাকে নাকি ভ্রাম্যমাণ আদালতে দিবে, এ জন্য ভয়ে বাড়িতে যেতে পারছি না।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু বলেছেন, ‘যে নারী কথা বলার আগে ফেসবুক লাইভ করতে পারে, সে কি কোনো প্রমাণ না রেখেই আমাকে টাকা দিয়ে চলে গেল? তিনি একজন টিকটকার। তাকে দিয়ে এর আগেও নাকি অনেককে ব্ল্যাকমেল করা হয়েছিল। কোনো ষড়যন্ত্রকারী হয়তো তাকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের একেবারে নিম্ন পন্থাটা অবলম্বন করেছে।’ তিনি আরও দাবি করেন, অভিযোগকারী নারীকে তিনি চিনতেন না এবং তিনি দায়িত্বে থাকার সময়ে ওই নারী কখনো তার দপ্তরে আসেননি।
অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন।





