রাজশাহীর ৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের কমিটি, পদ পেলেন বিতর্কিতরা

প্রতিবাদে শুক্রবার (১৯ জুন) নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ ও সরকারি সিটি কলেজের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা, ছবি: আগামীর সময়
রাজশাহীর ৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কমিটিতে পদ পাওয়া বেশ কিছু নেতার পরিচয়, অতীত ইতিহাস ও কর্মকাণ্ড নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। কোথাও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, কোথাও বিবাহিত ব্যবসায়ী, কোথাও বিতর্কিত টিকটকার, আবার কোথাও অছাত্র ও মামলাভুক্ত ব্যক্তিরাও পেয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পদ।
মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ এই ৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন বিতর্কিতদের পদায়ন করায় রাজশাহীতে ছাত্রদলের রাজনীতি হয়ে উঠেছে উত্তপ্ত। এমন পরিস্থিতিতে মহানগর ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ বিষয়টি কেন্দ্রে অবহিত করলেও সমাধান আসেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বুধবার (১৭ জুন) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক), রাজশাহী কলেজ, সরকারি সিটি কলেজ, রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সংসদ।
কমিটি ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ক্যাম্পাস ও সংগঠনের অভ্যন্তরে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।
নতুন কমিটিতে রামেক ছাত্রদলের সহসভাপতি হয়েছেন মিজানুর রহমান। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি নতুন নয়। একসময় তিনি রামেক ছাত্রলীগের উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ছিলেন। হোস্টেলের কক্ষে গাঁজা সেবনের সময় ধরা পড়ার ঘটনায় শাস্তির মুখেও পড়েন তিনি। সে সময় তাকে হোস্টেল কক্ষ থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং ইন্টার্নশিপ স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের বিপক্ষে অবস্থানের অভিযোগে তার ইন্টার্নশিপ আরও এক বছরের জন্য স্থগিত হয়। সেই মিজানুরই এখন ছাত্রদলের সহসভাপতি।
একই কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন আবু হানিফা হানিফ। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, অতীতে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের প্রসঙ্গে একটি গ্রুপ চ্যাটে তার করা মন্তব্যও এখন আলোচনায় রয়েছে।
সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রদলের কমিটিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম আহ্বায়ক আবু সাঈদ হাসান। তিনি বিবাহিত এবং থাই-অ্যালুমিনিয়াম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার একটি সন্তানও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ত্রী ও পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত ছবি প্রকাশ করেন তিনি। ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তিনি বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে মনে করেন।
তার ভাষ্য, বড় ইউনিটগুলোতেও বিবাহিত নেতারা দায়িত্ব পালন করছেন।
সিটি কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব হয়েছেন শামানুল হক হৃদয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে টিকটকার হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত। বিভিন্ন সময় মদের বোতলের ছবি পোস্ট, আপত্তিকর ভিডিও এবং নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের কারণে তিনি আলোচনায় এসেছেন। ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর এক তরুণীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সম্প্রতি নগরের বিনোদপুর এলাকায় তাকে কান ধরিয়ে রাখার একটি ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সিটি কলেজের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রায়হান সুইটের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক অভিযোগ। ২০১৯ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়। মামলায় আদালতে অভিযোগপত্রও জমা দিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্য রয়েছে। গত বছর প্রতারণার অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায়ও তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল।
একই কলেজের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ পাওয়া আব্দুর রহমান ওমর ফারুককে স্থানীয় নেতাকর্মীরা অছাত্র বলে দাবি করছেন।
নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন মাহমুদ হাসান লিমন। তিনিও বিবাহিত। কলেজটির সিনিয়র সহসভাপতি রাইনুদ্দিন রানার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের মিছিল ও কর্মসূচিতে তার অংশগ্রহণের ছবিও পাওয়া গেছে।
সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়া রাতুল চৌধুরী ঐক্যকে স্থানীয় নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করছেন। তার পারিবারিকভাবেও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ। একই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাব্বির মাহমুদ খানের বিরুদ্ধেও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছিল বলেও জানা গেছে।
রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ নূর মোহাম্মদ ইমনকে ঘিরেও আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, তিনি একসময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আবার আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্রলীগ ও শিবির- উভয় ধারার নেতাদের সঙ্গে তার বিভিন্ন সময়ের ছবিও রয়েছে।
রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের সভাপতি শাকিল মণ্ডলকে নিয়েও রয়েছে শিবিরঘনিষ্ঠতার অভিযোগ। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন নেতার ছবি পাওয়া গেছে। একই প্রতিষ্ঠানের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমানের একটি পুরোনো ফেসবুক পোস্ট নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। সেখানে তিনি ছাত্রদলকে ‘ক্রস’ চিহ্ন দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবেই ছাত্রজীবন শেষ করার কথা লিখেছিলেন।
রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের নতুন কমিটির কয়েকজন নেতার পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, পদ পাওয়া অনেককেই আগে সংগঠনের কর্মসূচিতে দেখা যায়নি।
কমিটি ঘোষণার পর অসন্তোষ দ্রুত প্রকাশ্যে রূপ নেয়। শুক্রবার (১৯ জুন) নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ ও সরকারি সিটি কলেজের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। সড়ক অবরোধ করা হয়। টায়ার জ্বালিয়ে চলে প্রতিবাদ। সিটি কলেজে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে মাঠে সক্রিয় থাকা এবং রাজনৈতিক কারণে নির্যাতনের শিকার বহু কর্মী নতুন কমিটিতে স্থান পাননি। তাদের পরিবর্তে বিতর্কিত অতীতের ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনা হয়েছে।
রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের সহ-সভাপতির পদ পাওয়া সামিউল ইসলাম শিমুল পদত্যাগ করে জানালেন তার ক্ষোভের কথা। জানালেন, গণঅভ্যুত্থানের পরে যারা রাজনীতিতে এসেছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। এ ছাড়া বিতর্কিত অনেককে কমিটিতে রাখা হয়েছে। এজন্য তিনি পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
রাজশাহী মহানগর ছাত্রদলের সদস্য সচিব এমদাদুল হক লিমনও কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা খুবই হতাশ এবং মর্মাহত। কলেজ ইউনিটগুলোর কমিটি কীভাবে হয়েছে, সে বিষয়ে মহানগর ছাত্রদলের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হঠাৎ করেই কমিটি ঘোষণা করেছে।'
তার মতে, মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা অনেক ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মী মূল্যায়ন পাননি। সেই কারণেই তৃণমূলের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানানো হয়েছে। তবে কেন্দ্র থেকে এখনো কোনো ‘রেসপন্স’ করা হয়নি।






