অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা
ধান নয়, পচছে কৃষকের স্বপ্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উত্তরাঞ্চলের অন্য জেলার মতো কুড়িগ্রামেও উৎসবের মৌসুম। কিন্তু আনন্দের বাদ্য নয়, বাজছে বিষাদের সুর। ঘরে ঘরে নতুন বোরো ধানের পিঠাপুলির ধুম পড়ার কথা থাকলেও পরিবেশ ভারী হচ্ছে কৃষকের কান্না ও আহাজারিতে। টানা বৃষ্টিতে চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে সোনালি ধান, জমিতেই পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে সার-জল দিয়ে গড়া স্বপ্ন ও সম্ভাবনা।
ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর ব্যস্ত এ সময় চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হয় বর্ষণ। সেই থেকে চলে ছয় দিন। মাঝে দুদিনের বিরতি দিয়ে আবার শুরু হয়েছে বারিধারা। তাতেই মহাক্ষতি কৃষকের। নিম্নাঞ্চলের ধান নষ্ট হচ্ছে জমিতেই। খড় হিসেবে যা গরুকে খাওয়ানো হতো, তা-ও গেছে পচে। এর মধ্যেই নতুন করে ৭২ ঘণ্টার ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, চলতি বোরো মৌসুমে কুড়িগ্রামে ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে ধান। এখনো অর্ধেক ফসল রয়ে গেছে জমিতে। সেগুলো পাকার পরও কাটা যাচ্ছে না বৃষ্টির কারণে। আবার কাটলেও তা মাড়াই করা যাচ্ছে না, উপায় নেই শুকানোরও। এরই মধ্যে ক্ষেত থেকে আসছে খড় ও ধানপচা গন্ধ।
মাঝে বৃষ্টি কমায় তিন দিন জেলায় ধান কাটার হার ভালো ছিল দাবি করে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানালেন, জমিতে থাকা বেশিরভাগ ধান কাটার উপযুক্ত হলেও ডুবে যাচ্ছে পানিতে। অনেক ক্ষেতে ধানের গলা ছুঁইছুঁই পানি। এর সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে উঁচু জমির শাকসবজিসহ অন্য ফসল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে সুর মেলালেন সদর উপজেলার কৃষক মামুনুর রশিদ কাজল। তিনি এবার তিন একর জমিতে আবাদ করেছেন বোরো। দেড় একর কাটতে পারলেও অবশিষ্ট ধান পচছে জমিতেই। কাটলেও রক্ষা নেই; শুকানোর মতো রোদ উঠছে না। এবার মনে হয় এই দেড় একর জমির ধান ঘরে উঠবে না— হতাশা প্রকাশ করলেন তিনি।
মাঝে দুদিনে কিছু ধান কাটতে পারার তথ্য দিলেন একই এলাকার কৃষক জমির উদ্দিন। তার ভাষ্য, জমিতে এখনো অর্ধেক ধান রয়েছে। বৃষ্টির জন্য যাচ্ছে না কাটা। আবার যা কাটা হয়েছে, সেগুলোও রোদের অভাবে গজিয়ে যাচ্ছে বস্তাতেই।
ছাতা মাথায় নিজের ক্ষেত দেখছিলেন রাজারহাটের ছবুর মিয়া। তিনি তুলে ধরলেন আরেক হতাশার কথা, ‘আম-ছালা দোটই গেল। ধানের সঙ্গে নষ্ট হয়ে গেল খড়ও। এখন অর্ধেক ধান কাটার বাকি। এই ফসলের কপালে কী হবে— আল্লাহই জানেন! দামও পাই না, খাবারও পাই না।’
আরও করুণ সুর সদর উপজেলার যাত্রাপুরের কৃষক মোয়নালের কণ্ঠে, ‘এক নৌকা ধান কাটি আনছি। আল্লাহ জানে বাকিগুলার কপালত যে কী আছে! ধান আর পোয়াল (খড়) নিয়া বিপদত আছি। যেগুলা কাটছি তার পোয়ালও (খড়) শুকবার পাবানচি না (পারছি না)। এলাও জমিত পাকা ধান পড়ি আছে। এমন করি ঝড়ি (বৃষ্টি) হইলে কাটমো কেমন করি?’
সড়কের পাশে বসে দুশ্চিন্তায় মাথা চুলকাচ্ছিলেন মরিয়ম খাতুন। বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘দেওয়ার (আকাশ) কোনো ঠিক আছে, কহন যে নামে কে জানে। আইজ তিন দিন ধরি দান শুকাই এই বৃষ্টি আসে এই যায়। দুনিয়ার জ্বালা!’
মাঠের চিত্র সম্পর্কে অবগত থাকার দাবি করলেন কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। ‘বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা যাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত মাঠ পরিদর্শন করছি, অনেক কৃষকের অর্ধ শুকনো খড় আবার ভিজে গেছে। খড় পচে গেলে প্রাণিখাদ্যের সংকট হতে পারে’— আশঙ্কা প্রকাশ করলেন তিনি।
এই দুরবস্থার মধ্যেই নতুন করে আবার বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার। দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকারের তথ্য, এ অঞ্চলে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে বুধবার; সকাল ৬টা পর্যন্ত ১৮৩ মিলিমিটার। আর গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বর্ষণ হয় ১১৫ মিলিমিটার। আরও ৭২ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে।




