শেরপুরে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি, দিনরাত প্রতিমা গড়ছেন শিল্পীরা

ছবি: আগামীর সময়
বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় চলছে শারদীয় দুর্গাপূজার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও মাটির প্রতিমায় শেষ তুলির আঁচড়, কোথাও চলছে রং ও সাজসজ্জার কাজ। আবার কোনো মণ্ডপে তৈরি হচ্ছে পূজার মঞ্চ, চলছে আলোকসজ্জার আয়োজন। উৎসব ঘিরে মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। দিন-রাত কাজ করেও যেন দম ফেলার ফুরসত নেই তাদের।
উপজেলার বিভিন্ন প্রতিমা তৈরির কারখানা ও পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, শিল্পীদের নিপুণ হাতে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে দেবী দুর্গা ও তার সন্তানদের প্রতিমা। কোথাও প্রতিমার মাটির কাজ শেষ করে শুকানো হচ্ছে, কোথাও চলছে রং করার প্রস্তুতি। আবার কোনো কোনো প্রতিমায় পরানো হচ্ছে পোশাক, যুক্ত করা হচ্ছে অলংকার ও নানা সাজসজ্জার উপকরণ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।
উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক সৌমেন্দ্র নাথ ঠাকুর শ্যাম জানান, এবার শেরপুর উপজেলায় মোট ৯৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের তুলনায় এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে। পূজাকে ঘিরে ইতিমধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তাসহ সার্বিক আয়োজন এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমাশিল্পীরা জানান, একটি প্রতিমা তৈরির কাজ বেশ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করতে হয়। প্রথমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর খড় দিয়ে প্রতিমার অবয়ব তৈরি করে তাতে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। মাটি শুকিয়ে গেলে শুরু হয় সূক্ষ্ম কারুকাজ।
সবশেষে রং, পোশাক, অলংকার ও অন্যান্য সাজসজ্জার মাধ্যমে প্রতিমাকে দেওয়া হয় পূর্ণাঙ্গ রূপ। প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হয় সময়, শ্রম ও দক্ষতার।
দক্ষিণ সাহাপাড়া ষোলআনা মন্দিরের প্রতিমাশিল্পী শ্রীকান্ত দাস বলেন, প্রতিমার মাটির কাজ প্রায় শেষ। এখন রং ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা মণ্ডপে পৌঁছে দিতে দিন-রাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। পূজা যত ঘনিয়ে আসছে, কাজের চাপও তত বাড়ছে।
প্রতিমাশিল্পী প্রকাশ চন্দ্র রায় জানান, দুর্গাপূজা সামনে রেখে তাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে রং ও সাজসজ্জার কাজও সময়মতো সম্পন্ন করতে হচ্ছে। পূজার মৌসুমে কাজের চাপ বেশি থাকলেও বছরের অন্য সময় এ পেশায় কাজ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে অনেকটাই মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভর করে তাদের আয়-রোজগার।
শিল্পী শংকর পাল বলেন, প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় খরচও বাড়ছে। বাঁশ, খড়, মাটি, রং ও সাজসজ্জার বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তবে মণ্ডপ কর্তৃপক্ষের চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিমার সাজসজ্জায় বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছেন তারা। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে শ্রমের যথাযথ মূল্য ও সারা বছর কাজের সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে দুর্গাপূজাকে ঘিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেও শুরু হয়েছে উৎসবের প্রস্তুতি। নতুন পোশাক কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া এবং মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরার পরিকল্পনা করছেন অনেকে। পূজার দিনগুলোতে আরতি, ধর্মীয় সংগীত, গীতাপাঠসহ নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন আয়োজকেরা।
শেরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত জয়নুল আবেদীন জানান, এ উৎসবকে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পূজামণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, আসন্ন দুর্গাপূজাকে শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন করতে সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে শেরপুরে এখন দুর্গাপূজাকে ঘিরে উৎসবের শহরে পরিণত হয়েছে। একদিকে মৃৎশিল্পীদের হাতে মাটির প্রতিমা ধীরে ধীরে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে, অন্যদিকে পূজামণ্ডপগুলো সাজিয়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে সমানতালে। শিল্পীদের ঘাম, শ্রম ও নিপুণতায় পূর্ণতা পাচ্ছে প্রতিমা।



