গোবিন্দপুর
বর্ষা এলেই ব্যস্ত নৌকার কারিগরদের স্বপ্নঘর

ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই চর গোবিন্দপুরের খোলা মাঠে শুরু হয়ে যায় এক অন্যরকম কর্মযজ্ঞ। চারদিকে ভেসে আসে পেরেক পেটানোর খটখট শব্দ, কোথাও কাঠ চেরাইয়ের করাতের সুর, আবার কোথাও নৌকার তলা বসানোর ব্যস্ততা।
সূর্যের প্রথম কিরণ ফুটতেই হাতুড়ি, পেরেক আর কাঠের গন্ধে মুখর হয়ে ওঠে মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকা।
বর্ষার আগমনী বার্তা নিয়ে যখন নদী-খাল-বিলে পানি বাড়তে শুরু করেছে, তখনই বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার নৌকা তৈরির কারিগররা। খোলা মাঠ জুড়ে সারি সারি কাঠের পাটাতনের ওপর গড়ে উঠছে একের পর এক নৌকা। আর সেই নৌকাগুলো কিনতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ক্রেতারা।
নদীবেষ্টিত মাদারীপুরে বর্ষা মানেই বিস্তীর্ণ জনপদ পানিতে ডুবে যাওয়া। যুগের পর যুগ এই অঞ্চলের মানুষের চলাচল, কৃষিকাজ এবং জীবিকার অন্যতম ভরসা হয়ে আছে নৌকা। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এখনো টিকে আছে চর গোবিন্দপুরের নৌকাশিল্প।
সরেজমিন দেখা যায়, খোলা আকাশের নিচে কারিগররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন নৌকা তৈরির কাজে। কেউ কাঠ কেটে মাপ ঠিক করছেন, কেউ কাঠ চেঁছে জোড়া লাগাচ্ছেন, আবার কেউ নৌকার ওপর উঠে তলা সমান করছেন। শুধু কারিগররাই নন, পরিবারের সদস্যরাও তাদের কাজে সহায়তা করছেন। একটি নৌকা তৈরি শেষ হলেই শুরু হয় নতুন আরেকটি নৌকার কাঠামো তৈরির প্রস্তুতি। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলতে থাকে এই নিরবচ্ছিন্ন কর্মব্যস্ততা।
নৌকা তৈরির কারিগর ইয়াকুব মোল্লা ২৮ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানালেন, প্রতিদিন গড়ে একটি করে নৌকা তৈরি করেন। প্রতি মৌসুমে ১০০টিরও বেশি নৌকা বিক্রি করেন।
ইয়াকুব মোল্লা যোগ করেন, এ অঞ্চলে নৌকার অনেক চাহিদা। ধান-পাটের কৃষকদের নৌকা ছাড়া চলেই না। বর্ষা এলেই আমরা নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আকার ও কাঠভেদে প্রতিটি নৌকা ৮ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
একই পেশায় যুক্ত কারিগর বাদল হোসেন জানালেন, রেন্ডি, জিলাপি, জারুল ও মেহগনি কাঠ দিয়ে তারা নৌকা তৈরি করেন। তবে কাঠ ও পেরেকের দাম বৃদ্ধির কারণে আগের তুলনায় লাভ অনেক কমে গেছে।
তিনি বললেন, একটি নৌকায় অন্তত দুই হাজার টাকা লাভ হয়; কিন্তু বর্তমানে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই লাভও কমে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিন জানালেন, বহু বছর ধরে চর গোবিন্দপুরে নৌকা তৈরির এই ঐতিহ্য চলে আসছে। এবারও পাঁচটি থল বা কর্মস্থলে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি করে নৌকা তৈরি করা হয়েছে। বরিশাল, ফরিদপুর ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা এসে এসব নৌকা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
নৌকা কিনতে আসা আজিজুল ইসলামের মতে, নৌকার দাম এখন অনেক বেশি; কিন্তু আমাদের জন্য নৌকা অপরিহার্য। পাট জাগ দেওয়া, জাগ তোলা কিংবা গরুর জন্য ঘাস কাটতে নৌকা লাগেই। তাই প্রয়োজনের তাগিদেই কিনতে হচ্ছে।
খোয়াজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী রোমান সরদার বলেছেন, বর্ষা মৌসুম এলেই চর গোবিন্দপুর, মঠেরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় নৌকা তৈরির ধুম পড়ে যায়। নিচু অঞ্চলের মানুষের জন্য নৌকা এখনো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বাহন। কারিগরদের যেকোনো প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় স্থানীয় প্রশাসন পাশে থাকবে বলেও জানালেন তিনি।
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বললেন, নৌকা শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে এর সম্পর্ক বহু পুরনো। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।




