মৌসুমের গণ্ডি পেরিয়ে বিরামপুরে বারোমাসি সজনে

ছবি: আগামীর সময়
সাধারণত নির্দিষ্ট মৌসুমে বাজারে বেশি দেখা মেলে সজনে ডাটার। মৌসুম শেষ হলে কমে আসে সরবরাহ, বাড়ে দাম। এই সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সারা বছর সজনে উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করতে দিনাজপুরের বিরামপুরে নেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। উপজেলার বিভিন্ন সড়কের দুই ধারে লাগানো হয়েছে প্রায় চার হাজার বারোমাসি সজনে গাছ।
জানুয়ারি মাসে লাগানো এসব গাছে এখন ডাটা ধরতে শুরু করেছে। গাছ থেকে সংগ্রহ করা সজনে বাজারেও আসছে। উদ্যোগটি সফল হলে স্থানীয় বাজারে সবজির সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য তৈরি হতে পারে বাড়তি আয়ের সুযোগ।
উপজেলার বিজুল, আয়ড়া, কেটরাহাট, শিবপুর, ভাইগড় ও কাটলা এলাকার সড়কের দুই ধারে লাগানো হয়েছে এসব গাছ। সড়কের পাশে সারি সারি সজনে গাছের ডালে ডালে ডাটা আসতে শুরু করায় স্থানীয়দের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে গাছের উৎপাদনক্ষমতা, নিয়মিত ফলন, পরিচর্যা এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার ওপর।
বিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কমল কৃষ্ণ রায় জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের দিকে উপজেলায় প্রায় চার হাজার বারোমাসি সজনে গাছ লাগানো হয়েছে। বিজুল, আয়ড়া, কেটরাহাট, শিবপুর, ভাইগড় ও কাটলা এলাকার সড়কের দুই ধারে এসব গাছ রয়েছে। গাছগুলোতে ইতোমধ্যে ডাটা ধরতে শুরু করেছে এবং উৎপাদিত সজনে বাজারে আসছে।
তার মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে সজনের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পুষ্টিকর সবজির জোগান বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
মৌসুমি সবজি থেকে নিয়মিত সরবরাহের প্রত্যাশা
বিরামপুরের গ্রামাঞ্চলে বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় ও পতিত জমিতে সজনে গাছ লাগানোর প্রচলন দীর্ঘদিনের। অনেক পরিবার নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত ডাটা বিক্রি করে কিছু আয় করে। তবে পরিকল্পিতভাবে বারোমাসি জাতের সজনে উৎপাদন করা গেলে তা পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
উপজেলার ভেলারপাড় গ্রামের কৃষক মোজাহার আলী ও ইয়াসিন আলীর বাড়িতে রয়েছে দুটি সজনে গাছ। তারা জানান, এ বছর গাছ দুটিতে ভালো ডাটা ধরেছে। পরিবারের চাহিদা মেটানোর পর আত্মীয়স্বজনকে দেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ডাটা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন। তাদের অভিজ্ঞতায়, বাড়ির আশপাশে জায়গা থাকলে সজনে গাছ পরিবারের সবজির চাহিদা পূরণে সহায়ক হতে পারে।
তবে বাড়ির আঙিনায় কয়েকটি গাছ থেকে পাওয়া ফলন আর বাণিজ্যিকভাবে বারোমাসি সজনে উৎপাদন এক বিষয় নয়। বাণিজ্যিক চাষে উৎপাদন খরচ, গাছপ্রতি ফলন, ডাটা সংগ্রহের সময়, শ্রমিকের মজুরি এবং বাজারে বিক্রির খরচ হিসাব করা জরুরি। এসব তথ্যের ভিত্তিতে চাষের লাভজনকতা নির্ধারণ করা সম্ভব।
বাজারে কেমন দাম, কী বলছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা
বিরামপুরের স্থানীয় বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি সজনে ডাটা পাইকারিতে ২০০ থেকে ২১০ টাকা এবং খুচরায় ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চাহিদা থাকায় স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সজনে পাঠানো হচ্ছে বলে স্থানীয় বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বর্তমান দামে উৎপাদকদের জন্য সজনে বিক্রির সুযোগ থাকলেও বাজারদর সব সময় একই থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে, আবার চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকলে দাম বাড়তে পারে। ফলে বারোমাসি সজনে চাষের ক্ষেত্রে শুধু উচ্চ বাজারদরের ওপর নির্ভর না করে উৎপাদন ও বিপণনের পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় এক সবজি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সজনে মৌসুমে ক্রেতাদের চাহিদা থাকে। তবে দাম বেশি হলে অনেকে পরিমাণে কম কেনেন। বাজারে সরবরাহ বাড়লে বিক্রি বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বারোমাসি গাছ থেকে নিয়মিত ডাটা পাওয়া গেলে বছরের বিভিন্ন সময়ে সজনে বিক্রির সম্ভাবনাও বাড়বে।
বাজারে সজনে কিনতে আসা এক ক্রেতার মতে, এটি পরিবারের পছন্দের একটি সবজি। কিন্তু দাম বেশি থাকলে নিয়মিত কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। সরবরাহ বাড়লে দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালে আসবে বলে আশা তার।
পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ, চাষেও সম্ভাবনা
সজনে ডাটা পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি সবজি। এতে বিভিন্ন ভিটামিন, খণিজ উপাদান ও খাদ্যোপযোগী পুষ্টি উপাদান রয়েছে। বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. লুৎফর রহমান বলেন, সজনে ডাটা সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে সহায়তা করতে পারে।
অন্যদিকে সজনে গাছ তুলনামূলক কম পরিচর্যায় বেড়ে উঠতে পারে। গাছের ডাল থেকে নতুন গাছ তৈরির সুযোগ থাকায় বাড়ির আঙিনা ও অব্যবহৃত জায়গায় এর বিস্তার ঘটানো সম্ভব। তবে ভালো ফলন পেতে উপযুক্ত জাত নির্বাচন, মাটির অবস্থা, পানি নিষ্কাশন, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিতে হবে।
স্থানীয়ভাবে রাইখঞ্জন ও ঝুল জাতের সজনে বেশি পরিচিত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিরামপুরে লাগানো চার হাজার গাছের মধ্যে কোন জাতের গাছ কতটি রয়েছে, গাছগুলোর প্রত্যাশিত ফলন কত এবং বছরের কোন কোন সময়ে ডাটা পাওয়া যাবে—এসব তথ্য জানা গেলে বারোমাসি সজনে উৎপাদনের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
চার হাজার গাছের উদ্যোগ কতটা বদলাবে কৃষি অর্থনীতি
বিরামপুরে সড়কের দুই ধারে লাগানো চার হাজার বারোমাসি সজনে গাছের উদ্যোগকে শুধু গাছ লাগানোর কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যথাযথ পরিচর্যা ও উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে এসব গাছ স্থানীয় বাজারে সবজির জোগান বাড়াতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদিত ডাটা বিক্রির মাধ্যমে আয় সৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে উদ্যোগটির অর্থনৈতিক সাফল্য মূল্যায়নে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—প্রতি গাছে কত কেজি ডাটা পাওয়া যাচ্ছে, বছরে কতবার ফলন হচ্ছে, উৎপাদিত ডাটার কতটা বাজারজাত করা যাচ্ছে এবং পরিচর্যা ও সংগ্রহে কত খরচ হচ্ছে। এসব তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে বারোমাসি সজনে চাষের লাভ-ক্ষতি নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চাষ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের মধ্যে সমন্বয় করা গেলে বারোমাসি সজনে স্থানীয় কৃষিতে সম্ভাবনাময় একটি সংযোজন হতে পারে। বিরামপুরের চার হাজার গাছ এখন সেই সম্ভাবনার প্রাথমিক ইঙ্গিত দিচ্ছে। মৌসুমের সীমা পেরিয়ে নিয়মিত উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে সজনে একদিকে যেমন পুষ্টিকর সবজির জোগান বাড়াবে, অন্যদিকে কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্যও নতুন আয়ের পথ তৈরি করতে পারে।



