ইসরাফিলের শেষ আর্তনাদ
‘বাবা, আমি পড়ে গেলাম’

ইসরাফিলের বাবা দেলোয়ার হোসেন ও মা নুরুন্নাহার
‘বাবা, আমি পড়ে গেলাম’ ঠিক এটুকুই ছিল— তিন বছরের নিষ্পাপ শিশু ইসরাফিলের শেষ আর্তনাদ। এই একটি বাক্যের সঙ্গে সঙ্গে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ধুশুন্ডি গ্রামের একটি ছোট ঘর চিরকালের জন্য হয়ে গেল নিস্তব্ধ।
পদ্মার উত্তাল ঢেউ আজ শুধু একটি বাসের ধ্বংসাবশেষ বহন করছে না, তার সঙ্গে বয়ে নিয়ে গেছে এক দম্পতির কলিজার টুকরো, এক দাদীর বেঁচে থাকার অবলম্বন আর আগামী দিনের এক সম্ভাবনাময় ‘বস-এর স্বপ্ন।
গত বুধবার (২৫ মার্চ) বিকালে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটের পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস যখন পদ্মা নদীতে পড়ে যায়, তখন সেই যমদূতসম বাসের যাত্রী ছিলেন দেলোয়ার হোসেন (৩৫), তার স্ত্রী নুরুন্নাহার এবং তাদের একমাত্র আদরের সন্তান ছোট্ট ইসরাফিল। ঢাকা থেকে ঈদের ছুটি শেষে সপরিবারে কর্মস্থলে ফিরছিলেন দেলোয়ার।
ইসরাফিলের বয়স মাত্র তিন বছর। সবকিছুতেই অবাক দৃষ্টি। ফেরি ঘাটে যখন বাস থামল, তখন ইসরাফিলের চোখ পড়ল ফেরির পন্টুনের ধারে। দেলোয়ার ছেলের বায়না মেটাতে চিপস কিনে দিতে বাস থেকে নেমেছিলেন। দেলোয়ার ছেলেকে বলেছিলেন— তোমার দাদা নদীতে মাছ ধরে, বাবার এ কথা শুনে ছোট্ট ইসরাফিল বলেছিল, আমিও নদীতে যাব। দেলোয়ার ছেলেকে শান্ত করে বলেছিল, পরে নিয়ে যাব।
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাসের হর্ন বেজে ওঠে। তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে দেলোয়ার ও তার ছেলে বাসে ওঠেন। মা নুরুন্নাহার আগেই বাসে বসা ছিলেন। বাসে ওঠার পর স্টার্ট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটল সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা। চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সোজা গিয়ে নদীতে পড়ে। ইসরাফিল তখনও বাবার কোলে ছিল।
বাসটি নদীতে পড়ার সময় পেছনের দিকটা যখন উঁচু হলো, তখন আমার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগে, সেসময় ছেলেটা হঠাৎ ভয়ে চিৎকার করে বলল, ‘বাবা, আমি পড়ে গেলাম’। আমি তখন ওকে আঁকড়ে ধরেছিলাম। কিন্তু তারপরই বাসের ভেতর পানি ঢুকে পড়ে পানির প্রবল ধাক্কায় ছেলেটা আমার কোল থেকে ছিটকে দূরে সরে গেল। ঘটনার স্মৃতিচারণ করে এসব কথা বলছিলেন নিহত শিশু ইসরাফিলের বাবা দেলোয়ার হোসেন।
কথাগুলো বলতে গিয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি। আর কথা বলতে পারছিলেন না। পরে কথা হয় ইসরাফিলের মা নুরুন্নাহার সঙ্গে।
‘বাসের মধ্যে বসেছিলাম। ঘটনার আকস্মিকতায় তখন নির্বাক হয়ে গেলাম। কীভাবে বাস থেকে বের হয়েছি তা মনে নেই। পরে স্বামী দেলোয়ারের সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করি ‘ছেলে কই?’ পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সেসময় ছেলেকে পাইনি’— বলছিলেন ইসরাফিলের মা।
পরে ইসরাফিলের নিথর দেহ হাসপাতালের খুঁজে পান। চিপস কিনে নিয়ে যে বাসে উঠেছিল ছেলেটা, সেই বাসের মধ্যেই সে তার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে—জানালেন নুরুন্নাহার।
ইসরাফিলের বাড়িতে গিয়ে আজ বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা গেল বারান্দায় বসে দাদি মনোয়ারা বেগম বিলাপ করছেন। তিনি বারবার কেঁদে কেঁদে নাতি ইসরাফিলের কথা বলছেন। ‘আমার বেটা ঢাকায় যেতে চাইত না’, যাওয়ার সময় ও আমার কপালে চুমু দিয়ে বলেছিল— ‘দাদি, আমি বস হবো। তোমার অসুখের চিকিৎসা করাব’। আমার সোনা কত কথা বলত আমার সঙ্গে, আমি এখন কার সঙ্গে কথা বলব?’
ইসরাফিলের বাবা দেলোয়ার হোসেন ঢাকার আশুলিয়ার একটি ট্রেনিং সেন্টারের স্কেভেটর ও ফর্কলিফট ট্রেনার। পরিবার নিয়ে ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। ছুটি শেষে বুধবার (২৫ মার্চ) ঢাকায় কর্মস্থলে ফিরছিলেন। তাদের বাসে অন্তত ৫০ জন যাত্রী ছিল। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।
এ ঘটনায় সর্বশেষ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলার শিশুসহ ৪ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন। তারা হলেন, কুষ্টিয়া পৌরসভার মজমপুর গ্রামের মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), কুষ্টিয়া খোকসা উপজেলার সমসপুর গ্রামের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা বিনতে গিয়াস (১৩), ইউনিয়নের ধুশুন্ডি গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইসরাফিল (৩), একই উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের খাগড়বাড়িয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮)।

