কুষ্টিয়ায় পীর হত্যা
‘মামলা করলে তারা আবার ঝামেলা করবে’

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে দিনরাত চাপা আতঙ্ক। টহল দিচ্ছে পুলিশ, মাঝে মাঝে আসছেন নানা কর্মকর্তা। লেগে আছে সাংবাদিকদের আনাগোনা। সবই ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’ নামে পরিচিত আস্তানা ঘিরে। দুদিন আগে সেখানে পীর আব্দুর রহমান শামীম ওরফে জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে-পিটিয়ে হত্যা করে ‘মব’। ভাঙচুরে-আগুনে এখন বেহাল আস্তানা।
৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়েছে ঘটনার। ফেসবুকে-সংবাদমাধ্যমে আছে হামলার বেশকিছু ভিডিও-ছবি। তবুও আটক করা যায়নি জড়িত কাউকে। পরিবার বা পুলিশ, কোনো পক্ষ থেকে হয়নি মামলাও। পুলিশ অপেক্ষায়, পরিবার করবে মামলা। আর পরিবার ‘ঝামেলা’ নয়, চাইছে শান্তি।
পরিবারের এই চাওয়ার পেছনে কী? কথা হয় নিহত শামীম জাহাঙ্গীরের মেঝ ভাই গোলাম রহমান পিন্টুর (৬৫) সঙ্গে।
‘ইসলাম তো আইন হাতে নেওয়ার কথা বলেনি। যদি সে অন্যায় করত, তবে তার নামে মামলা হতে পারত, সে জেল খাটত। কিন্তু তাকে একেবারে মেরে ফেলা কি ঠিক হলো? আমরা নিরিবিলি থাকতে চাই, মামলা করলে উশৃঙ্খল ছেলেরা আবার ঝামেলা করবে।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন পিন্টু। এখন অবসর নিয়ে আছেন বাড়িতেই। মা-ভাইদের পরিবার নিয়ে বড় সংসার। ছোট ভাইয়ের এমন মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ-আতঙ্কিত তিনি। ঘটনার পর থেকে পরোক্ষভাবে পাচ্ছেন কিছু হুমকি। পুলিশ টহল থাকলেও কাটছে না শঙ্কা। তবে হুমকির বিষয় নিয়ে কথা বাড়াতে নারাজ পিন্টু ও তার পরিবার।
গতকাল শনিবার পর্যন্ত নিহত শামীমের পরিবারের মামলা করার অপেক্ষায় ছিল পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন বলেছিলেন, মামলা করার ব্যাপারে তাদের থেকে ইতিবাচক আশ্বাস পেয়েছেন। ঘটনার নেপথ্যে কোনো সুপরিকল্পিত ইন্ধন ছিল কি না, খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
আজ বিকালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেছেন, ‘এখনও কোনো মামলা হয়নি, প্রক্রিয়া চলছে। পরিবার মামলা না করলে অন্য কেউ মামলা করবে কিনা বা পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।’
দুইদিনেও হামলাকারীদের কেউ শনাক্তের বা আটকের খবর নেই কেন? এ প্রশ্নে পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাব একটাই- চলছে তদন্ত। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ সদস্য জানালেন, হামলায় নেতৃত্ব দেয়া ১৫ থেকে ২০ জন চিহ্নিত। মামলা হলেই নেয়া হবে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শনিবার দুপুরে ফিলিপনগরের দারোগার মোড় এলাকার ওই আস্তানায় চলে হামলা। স্থানীয় কয়েকশ লোক অংশ নেয় তাতে। আস্তানায় চলে ভাঙচুর, দেয়া হয় আগুন। আস্তানাতেই পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় শামীম রেজাকে। আহত হন তার তিন ভক্ত মহন আলী, জামিরুন ও জুবায়ের। তারা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে অবস্থা। রোববার দুপুরে ময়নাতদন্তের পর মরদেহ হস্তান্তর করা হয় পরিবারে। পুলিশের তত্ত্বাবধানে শামীমকে দাফন করা হয় এলাকার কবরস্থানে।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এবং ফেসবুক ঘেঁটে জানা গেছে, গত শুক্রবার রাতে ‘সত্যের সন্ধানে ফিলিপনগর’, ‘আনসারুল্লাহ মোজাহিদ’, 'আনিস জাফরী’, 'মো. মিজান হাওলাদার'- এসব নামে খোলা ফেসবুক আইডি ও পেজ থেকে ছড়ানো হয় পীর শামীমের একটি ভিডিও। ২০২২ সালের ওই ৩৬ সেকেন্ডের ভিডিও দিয়ে অভিযোগ তোলা হয়, ইসলাম ধর্মের অবমাননা করেন শামীম।
শনিবার সকালের মধ্যে ভিডিওটি ভাইরাল হলে আস্তানার আশপাশে জড়ো হতে থাকেন ক্ষুব্ধ লোকজন। উত্তেজনার খবরে আসে এলাকার পুলিশও। দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশের উপস্থিতিতেই শতাধিক লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আস্তানায় হামলে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, হামলাকারীদের মধ্যে ছিল এলাকার মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও স্থানীয় অনেকে। হামলায় গুরুতর আহত শামীমকে পুলিশ পরে উদ্ধার করে নেয় স্থানীয় হাসপাতালে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যু হয় তার।
‘দুপুরের দিক আমি দরবারের গেটের সামনে দাড়া ছিনু (ছিলাম)। দেখনু (দেখলাম) বেশ কয়েকজন মানুষ রড-লাঠি নিয়ে মিছিল করছে। তারা স্লোগান দিতে দিতে দরবারের গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেল। ভাঙচুর শুরু করতে থাকে কয়েকজন। দরবারের দোতলায় বাবার (পীর) ঘরের সামনে যায় তারা। দরজা লাথি দিয়ে ভাঙে। ভেতরে বাবাকে গলা ধরে টেনে বের করে হাতে থাকা রড দিই মারতে থাকে। টেনেহিঁচড়ে নিচে নামায়। সেখানে একজন বলতে থাকে- বাইচে আছেরে এখনও, মারেক। এভাবে পিটাইয়া মারা হয়’- বর্ণনা দিলেন পীর শামীমের ভক্ত জামিরন।
সোমবার এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানালেন, ভিডিও ছড়ানো পেইজগুলো ফিলিপনগর ইউনিয়ন থেকেই চালানো হয়। হামলাকারীরা স্থানীয়দের কাছে অপরিচিত নন। এখনও এলাকায় আছেন তারা।
খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কথা বলেছেন সংবাদমাধ্যমে।
‘ধর্ম অবমাননা যেমন অপরাধ, তেমনি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানোও সমান বিচারযোগ্য অপরাধ। আমরা পুরো বিষয়টি তদন্ত করছি।’
এদিকে, শামীমের ওই ভিডিওতে তার পাশে থাকা প্রখ্যাত বাউল শিল্পী শফি মণ্ডলের বাড়িতেও মোতায়েন হয়েছে পুলিশ। ফিলিপনগরে বাড়ি হলেও শিল্পীর অবস্থান এখন ঢাকায়।
বাড়িতে থাকা তার মেয়ে শিল্পী লিনা মণ্ডল দিলেন পরিস্থিতির বর্ণনা।
‘আমার বাবা একজন সাধক শিল্পী। সংগীতের প্রয়োজনে তিনি বিভিন্ন দরবারে যান। ফিলিপনগরে আমাদের বাড়ি হওয়ায় তিনি ওই দরবার শরিফেও গিয়েছিলেন। সেই সময়ের কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে একটি পক্ষ মব তৈরি করেছে। আমার বাবা লালন দর্শনের অনুসারী হিসেবে সারা বিশ্বে লালন সাঁইজির বাণীর প্রতিনিধিত্ব করেন। মবের জড়িতরাই মূলত এই ছবিগুলো ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।’
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে শিল্পী শফি মণ্ডলের বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে তার বাড়িতে হামলার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে নেই। আমরা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি করেছি।’




