চার নদীর ভাঙনে ছোট হচ্ছে বরগুনার মানচিত্র

ছবি: আগামীর সময়
বরগুনায় তিনটি খরস্রোতা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব কয়েক হাজার পরিবার। ভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন ছোট হয়ে আসছে জেলার মানচিত্র, এমন অভিযোগ নদীপাড়ের বাসিন্দাদের। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে আরও শত শত গ্রাম।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় নদীগুলোয় স্রোত ও ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে এবং কয়েকটি প্রকল্পের ডিপিপি পরিকল্পনা দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলার নলটনা এলাকার বিষখালী নদীপাড়ের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর খন্দকার জানিয়েছেন, পাঁচ ভাই মিলে পৈতৃক সূত্রে প্রায় ২৯০ বিঘা কৃষিজমির মালিক ছিলেন তারা। একসময় গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ আর গবাদিপশুতে সমৃদ্ধ ছিল তাদের পরিবার। কিন্তু গত পাঁচ দশকের অব্যাহত নদীভাঙনে সব জমিই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন শেষ সম্বল হিসেবে রয়েছে শুধু বসতঘরটি। সেটিও টিকবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার পরিবারের।
তিনি বললেন, ‘ভোটের সময় জনপ্রতিনিধিরা শুধু আশ্বাস দেন। কিন্তু ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। হয়তো এ বর্ষাতেই শেষ আশ্রয়টুকুও হারাতে হবে।’
একই চিত্র পাথরঘাটা উপজেলার জিনতলা গ্রামেও। ৬৬ বছর বয়সী হেমায়েত হোসেন বললেন, ‘চারবার বেড়িবাঁধ ভাঙতে দেখছি। জমি গেছে, ঘর গেছে। এখন খাসজমিতে থাকি।’
পাথরঘাটার বাসিন্দা মো. শাহিন জানিয়েছেন, একসময় তাদের পরিবারকে এলাকায় ‘জমিদার’ বলা হতো। ৩০-৩৫ জন চাষি তাদের জমিতে কাজ করতেন। কিন্তু আজ সেই বিশাল জমিদারি বিষখালী নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
তালতলী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া এলাকার কালাম হাওলাদারের ভাষ্য, ‘পায়রা নদীর ভাঙনে তিনবার ঘর হারিয়েছি। একসময় ৩৬ কানি জমি ছিল, এখন সরকারি বেড়িবাঁধের পাশে ঘর তুলে থাকছি। প্রতিবছর মাটি দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলেও তা টেকসই হচ্ছে না। স্থায়ী সমাধানের জন্য কংক্রিট ব্লক দিয়ে নদীশাসনের দাবি জানান তিনি।
সোনাকাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইউনুস ফরাজীর মতে, ’ফকিরহাট বাজারসহ বেশ কিছু এলাকা বঙ্গোপসাগরের ভাঙনে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো ইউনিয়ন হুমকির মুখে পড়বে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা জেলার মধ্য দিয়ে পায়রা ও বিষখালী নদী প্রবাহিত হয়েছে। এ ছাড়া পূর্ব পাশে রয়েছে আন্ধারমানিক নদী এবং পশ্চিম পাশে বলেশ্বর নদী। এসব নদীর তীব্র স্রোতের কারণে জেলার অন্তত ৩৩টি এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শুধু বিষখালী নদীর দুই তীরে ৪৪ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনপ্রবণ।
এ ছাড়া পায়রা নদীর দুই তীরে অন্তত ১৯টি স্থানে ভাঙন চলছে। তীব্র ভাঙনকবলিত এলাকার মধ্যে রয়েছে তালতলী উপজেলার ফকিরহাট বাজার, নলবুনিয়া, তেঁতুলবাড়িয়া, জয়ালভাঙা, ছোট বগি, নকরি ও হাসারচর এলাকা।
আমতলী উপজেলার পয়সারবুনিয়া, আরপাঙ্গাশিয়া, বালিয়াতলী, বৈঠাকাটা, নয়া ভাঙালি এবং সদর উপজেলার জাঙ্গালিয়া, পূর্ব কেওড়াবুনিয়া ও পুরাকাটা ফেরিঘাট এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
আন্ধারমানিক নদীর ভাঙনে তালতলীর শিকারিপাড়া, নিউপাড়া ও কাজীরখাল এলাকায়ও প্রতিনিয়ত জমি বিলীন হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, প্রতি কিলোমিটার নদীভাঙন রোধে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। সে হিসেবে শুধু বিষখালী নদীর দুই তীরে কাজ করতে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া পায়রা, আন্ধারমানিক ও বলেশ্বর নদীর ভাঙন রোধে আরও ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষা জরুরি।
‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ বরগুনা জেলা শাখার সদস্য সচিব মুশফিক আরিফ বললেন, উপকূল রক্ষায় গাছ লাগানোর বিকল্প নেই। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধানের ভাষ্য, বিষখালী নদীর দুই পাড়ের প্রায় ৪৪ কিলোমিটার এলাকা চিহ্নিত করে ভাঙন রোধে প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। অন্যান্য নদীর ক্ষেত্রেও একই উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি জানিয়েছেন, বামনা শহর রক্ষা এবং রামনা ও কালিবাড়ি লঞ্চঘাট এলাকার ভাঙন প্রতিরোধে এক হাজার ৭৬৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার একটি ডিপিপি পরিকল্পনা দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।
তিনি যোগ করেন, জেলার বাকি ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর জন্যও বড় প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন হতে পারে।





