বিপন্ন রায়েন্দা খাল ঝুঁকিতে সুন্দরবনও
- প্লাস্টিক-পলিথিন ভেসে যাচ্ছে সুন্দরবনে
- বর্জ্য ফেলায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে খাল
- পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ
- খাল রক্ষার দাবি পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয়দের

রায়েন্দা খাল নিজেই এখন অস্তিত্ব সংকটে
বাগেরহাটের শরণখোলার প্রাণ হিসেবে পরিচিত রায়েন্দা খাল নিজেই এখন অস্তিত্ব সংকটে। বছরের পর বছর ধরে প্লাস্টিক, পলিথিন, হোটেল-রেস্তোরাঁর উচ্ছিষ্ট, বাজার ও বাসাবাড়ির বর্জ্য ফেলা হচ্ছে খালপাড়ে। ফলে একসময় খরস্রোতা এই খালের দক্ষিণ তীরের প্রায় আধা কিলোমিটার জুড়ে গড়ে উঠেছে বর্জ্যের পাহাড়। দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, সংকুচিত হচ্ছে খালের প্রস্থ, কমে যাচ্ছে পানিপ্রবাহ। তবে এর প্রভাব শুধু খালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জোয়ার-ভাটার স্রোতে এসব বর্জ্য ভেসে যাচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনেও, যা বনটির জীববৈচিত্র্যের জন্য ডেকে আনছে নতুন বিপদ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শরণখোলায় নির্ধারিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেন্দ্র না থাকায় পুরো রায়েন্দা বাজারের আবর্জনা ফেলা হচ্ছে খালপাড়ে। প্লাস্টিক ও পলিথিনের মতো অপচনশীল বর্জ্য জোয়ারের পানিতে ভেসে বলেশ্বর নদ হয়ে প্রবেশ করছে সুন্দরবনের খাল ও নদীতে। এভাবে চলতে থাকলে শুধু খাল নয়, সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যও পড়বে ঝুঁকির মধ্যে।
সুন্দরবনে নিয়মিত মাছ ধরেন জামাল হাওলাদার, হারুন মোল্লা, আবুল ফরাজী ও রিপন হাওলাদার। তারা বলছেন, বনের ভেতরে খালের চর, গাছের শ্বাসমূল এবং নদীতীরে অসংখ্য প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিন আটকে থাকতে দেখা যায়। পানির স্রোতের সঙ্গে এসব বর্জ্য জালেও উঠে আসে। এতে মাছ ধরার কাজ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশও।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, কটকা, কচিখালী, ডিমের চর, জামতলা সি-বিচসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় এখন অহরহ চোখে পড়ে প্লাস্টিকের পানির বোতল, ওয়ানটাইম প্লেট ও পলিথিন। এগুলোর বড় অংশই বনসংলগ্ন বাজার ও জনবসতি থেকে নদীতে ফেলা হয় এবং পরে স্রোতের টানে সুন্দরবনে গিয়ে জমা হয়।
বনাঞ্চলে দূষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাও পড়েছে বড় ধরনের চাপে। একসময় এই খাল দিয়ে ঢাকা ও খুলনা থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চ এবং পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করত। এখন নাব্য কমে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে নৌযান চলাচল।। ভাটার সময় মাছ ধরার ট্রলার, এমনকি ছোট ডিঙি নৌকাও অনেক স্থানে চরে আটকে যায়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্য খাতও পড়েছে ক্ষতির মুখে।
একই ধরনের দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন খালনির্ভর ব্যবসায়ীরাও। রায়েন্দা খালের উত্তর তীরে অবস্থিত সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার মো. কবির হাওলাদার, মজিবর তালুকদার ও আনোয়ার হোসেন জানালেন, এ খালই তাদের ব্যবসার প্রাণ; কিন্তু নাব্য কমে যাওয়ায় বড় ফিশিং ট্রলার ঘাটে ভিড়তে পারে না। এতে প্রতিদিনই পড়তে হচ্ছে আর্থিক ক্ষতির মুখে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বছর ধরে এই বর্জ্য যাচ্ছে কোথায়, আর কেনই বা হচ্ছে না স্থায়ী সমাধান। রায়েন্দা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান বাবুল তালুকদারের মতে, আগে বাজারসংলগ্ন বহু ডোবা ও নালায় বর্জ্য ফেলা হতো। পরে সেগুলো ভরাট করে বসতবাড়ি নির্মাণ হওয়ায় এখন আর নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। ফলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে বর্জ্য।
পরিবেশবিদরা বলছেন, বিষয়টি শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি জাতীয় সম্পদ সুন্দরবনকেও সংকটে ফেলছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র আহ্বায়ক নূর আলম শেখের ভাষায়, ‘বনসংলগ্ন এলাকার বাজার ও বসতবাড়ি থেকে নদী-খালে ফেলা প্লাস্টিক ও পলিথিন প্রতিদিন প্রবেশ করছে সুন্দরবনে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মাছ, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক বিকাশ। পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।’
প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও বাজার কমিটির সমন্বয়ে দ্রুত পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি— মনে করেন তিনি।
স্থানীয় প্রশাসনও সমস্যার গুরুত্ব স্বীকার করেছে। শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) অর্থিতা হাওলাদারের ভাষ্য, ‘খালের পাড়ে বা যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুতই নেওয়া হবে কার্যকর ব্যবস্থা।’






