বালুমহাল ঘিরে বেপরোয়া ‘হেলমেট বাহিনী’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নে বালুমহালকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কথিত ‘হেলমেট বাহিনী’। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শুভপুর, সোনাপুর ও জয়পুর এলাকার বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করছে প্রায় ৪০ সদস্যের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। গত ছয় মাসে সরকারি জব্দ করা বালুর স্তূপ থেকে অন্তত ৬৭ লাখ টাকার বালু লুটের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। এ সময় হামলার শিকার হয়েছেন এক সাংবাদিক, বিএনপি নেতা, দলীয়কর্মীসহ অন্তত সাতজন। তবে তিনটি মামলায় ৭০ জনকে আসামি করা হলেও গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র তিনজন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর শুভপুর ইউনিয়নের জয়পুর এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ১৭০টি বালুর স্তূপ জব্দ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব স্তূপে বালু ছিল প্রায় ৩৯ লাখ ঘনফুট। সম্প্রতি উপজেলা প্রকৌশলী তৌহিদুল ইসলাম সরেজমিনে গিয়ে পরিমাপ করে দেখেন, কয়েকটি স্তূপ থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০০ ঘনফুট বালু উধাও। প্রতি ঘনফুট ৩০ টাকা হিসাবে এর বাজারমূল্য প্রায় ৬৭ লাখ টাকা।
এদিকে গত ৯ জুলাই ফেনী নদীর তীরে বালু লুটের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে হামলা চালানো হয় মোহনা টিভির সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন সজীবের ওপর। তার অভিযোগ, হেলমেট ও মুখোশ পরা ৮-১০ জন তাকে বেধড়ক মারধর করে নদীতে ফেলে দেয়। উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ ঘটনায় ছাগলনাইয়া থানায় মামলা করেন তিনি। মামলায় কয়েকজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন এ সাংবাদিক।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী নেছার উদ্দিন ও রহিমা আক্তার বলেছেন, ‘সাংবাদিকের ওপর হামলার সময় তারা ঘটনাস্থলে ছিলেন। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করা হয়।’
একইভাবে গত ২৫ জুলাই রাতে বালুর ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জেরে উপজেলা যুবদলের নেতা রিয়াজ উদ্দিন টিপু, আদনান, হুমায়ূন, সোহেল ও ইমনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। টিপুর দাবি, শহীদ মিনার মাঠে বিরোধ মীমাংসার কথা বলে ডেকে নিয়ে তাদের ওপর হামলা করা হয়। হামলাকারীরা সবাই হেলমেট পরে ছিল। এ ঘটনায় করা মামলায় ১৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ তার।
ঘোপাল এলাকার বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠক আমের মক্কী বলেছেন, ‘দুই বছর ধরে একটি চক্র অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি স্থানীয়রা তিনজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিলেও তারা ছিলেন শ্রমিক ও ট্রাকচালক।’
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের স্থানীয় প্রতিনিধিও বালুমহালের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে হেলমেট ও মাস্ক পরা কয়েকজন তাকে অনুসরণ এবং বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বালু লুটের ঘটনায় বাদী হয়ে একটি মামলা করেন ছাগলনাইয়া থানার উপপরিদর্শক পঙ্কজ দাস। ওই মামলায়ও আসামি করা হয় কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক তানভীর মেহেদী বলেছেন, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন সজীব বলেছেন, ‘মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে; কিন্তু পুলিশ তাদের ধরতে পারছে না।’ একই অভিযোগ করে যুবদল নেতা রিয়াজ উদ্দিন টিপু বলেছেন, ‘আসামিদের সবাই এলাকায় রয়েছে। তারপরও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।’
তবে ছাগলনাইয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু তাহেরের দাবি, ‘মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত। এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
এদিকে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত বিএনপি নেতা আলমগীর সিদ্দিকী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন এবং হামলার সময় ঘটনাস্থলেও ছিলেন না।
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. আলমগীর বলেছেন, ‘এটি মূলত ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে কয়েকজনের বিরোধ। এর দায় দল নেবে না। আইন অনুযায়ী প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ ফারহানা পৃথার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে তিনি ছাগলনাইয়ার বাইরে আছেন। বালুর বিষয়টি যেহেতু সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেখেন, তাই এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর ফারুক আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বালু লুটের ঘটনায় মামলা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের এক সভায় এসব ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। সাংবাদিক সজীবকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘যারা এ হামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’




