১০ বছর ধরে অচেনা কবুতরদের খাওয়ান সবজি ব্যবসায়ী আশরাফুল

ছবি: আগামীর সময়
দুপুর সাড়ে ১টা বাজলেই যেন বদলে যায় দিনাজপুরের বিরামপুর পৌর শহরের নতুনবাজারের চিত্র। সবজি ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলামের দোকানের টিনের চাল, বিদ্যুতের তার ও আশপাশের জায়গাজুড়ে জড়ো হতে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর। ‘বাকবাকুম’ শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো বাজার। দোকানের বারান্দায় খাবারের থলে নিয়ে কর্মচারী এলেই শুরু হয় কবুতরগুলোর ওড়াউড়ি। খাবার ছিটিয়ে দেওয়া মাত্রই পাল্লাপাল্লি করে খেতে শুরু করে তারা।
এভাবেই প্রায় দশ বছর ধরে প্রতিদিন অচেনা কবুতরদের খাবার দিয়ে আসছেন ৫৭ বছর বয়সী আশরাফুল ইসলাম। কবুতরগুলো কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়—তা জানেন না তিনি। শুধু জানেন, প্রতিদিন দুপুরে তারা তার দোকানের সামনে আসে, আর তাদের জন্য অপেক্ষা করেন তিনিও।
আশরাফুলের ভাষ্য, ১০ বছর আগে তার দোকানের বারান্দায় একটি অচেনা কবুতর এসে বসে। মায়া করে সেটিকে খাবার দেন তিনি। পরদিন একই সময়ে আসে তিনটি কবুতর। তাদেরও খাবার দেন। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কবুতরের সংখ্যা। এখন প্রতিদিন পাাঁচ শতাধিক কবুতর তার দোকানের সামনে এসে হাজির হয়। খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ পর আবার উড়ে যায় যে যার গন্তব্যে।
কবুতরগুলোর জন্য প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন কেজি গম ছিটিয়ে দেন আশরাফুল। কখনো নিজেই খাবার দেন, আবার কখনো দোকানের কর্মচারীরা দায়িত্বটি পালন করেন। প্রতিদিনের এই খাবারের পেছনে তার খরচ হয় প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। মাসে ব্যয় হয় তিন চার হাজার টাকারও বেশি।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘কবুতরগুলোকে এভাবে খাওয়াতে পারলে মনের মধ্যে একটা ভালো লাগা কাজ করে। নিজের মধ্যে তৃপ্তি পাই। কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়, সেটা জানি না। শুধু প্রতিদিন এসে খাবার খায়, এটুকুই আমার আনন্দ।’
কবুতরের প্রতি তার এই ভালোবাসার পেছনে রয়েছে সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে থাকা জালালি কবুতরের স্মৃতি। আশরাফুল জানান, সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর খাবার খায় ও উড়ে বেড়ায়—এ দৃশ্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। সেখান থেকেই কবুতরের প্রতি তার আলাদা ভালোবাসা তৈরি হয়। বিশ্বাস, শুধু কবুতর নয়, সব জীবের প্রতিই মানুষের মমতা ও ভালোবাসা থাকা উচিত।
তবে আশরাফুলের খাবারের অপেক্ষায় শুধু কবুতরই থাকে না। একই সময়ে তাঁর দোকানের টিনের চালে আসে ২০ থেকে ৩০টি কাক। তাদের জন্য আলাদা করে পাউরুটি কিনে ছোট ছোট টুকরো করে ছড়িয়ে দেন তিনি। দিনের বিভিন্ন সময় মা-বিড়াল ও ছানাসহ চারটি বিড়ালও আসে খাবারের আশায়। পাশের আড়তের সবজি ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেন পুরুষ বিড়ালটির নাম দিয়েছেন ‘সম্রাট’। নাম ধরে ডাকলেই সেটি ছুটে আসে আশরাফুলের দোকানে। বিড়ালগুলোর জন্য পাশের দোকান থেকে কেক কিনে খাওয়ান তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুরের পর আশরাফুলের দোকানের টিনের চালে জোড়ায় জোড়ায় কবুতর এসে বসছে। বিদ্যুতের তারে পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ সারিতে বসে আছে আরও অনেক কবুতর। কিছুক্ষণ পর খাবারের থলে হাতে দোকানের কর্মচারী বারান্দায় আসতেই চারদিক থেকে কবুতরগুলো উড়ে এসে তাঁকে ঘিরে ফেলে। খাবার ছিটিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় খাওয়ার প্রতিযোগিতা। এমন দৃশ্য দেখতে দোকানি, ক্রেতা ও পথচারীরাও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন।
স্থানীয় সবজি ব্যবসায়ী মঞ্জু রহমান বলেন, ‘আশরাফুল ভাই সারা দিন ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকেন। মানুষ হিসেবে ভালো। এত ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়ম করে কবুতর, কাক ও বিড়ালকে খাবার দেন—এটা সত্যিই ভালো লাগার মতো বিষয়।’
নতুনবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী বাবলু বলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরে দেখছি, কবুতরগুলো বাইরে থেকে এখানে আসে। প্রতিদিন দুপুরে আশরাফুল ভাই তাদের খাবার দেন। এটা তাঁর একটা মহৎ কাজ।’
বিরামপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোঃ হুমায়ুন কবির বললেন, ‘জীবে প্রেম নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কাজ। আশরাফুল ইসলাম কোনো স্বার্থের প্রত্যাশা না করে প্রতিদিন এতগুলো পশুপাখিকে খাবার দিচ্ছেন। এটি প্রকৃতি ও জীবজগতের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসারই প্রকাশ।’
ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিদিন দুপুরে আশরাফুলের দোকানের সামনে তৈরি হয় অন্যরকম এক দৃশ্য। অচেনা কবুতরের ঝাঁক, কাকের কোলাহল আর বিড়ালের আনাগোনায় যেন বাজারের কোলাহলের মাঝেই গড়ে উঠেছে মানুষ ও প্রাণীর এক নীরব বন্ধুত্ব।





