রিকশা বাড়ে রকেট গতিতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রায় এক লাখ লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা, মিশুক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিপাকে পড়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক)। ‘এক রিকশা মালিকের এক লাইসেন্স, চালকেরও থাকতে হবে আলাদা ড্রাইভিং লাইসেন্স’ এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ার পর বেরিয়ে এসেছে নানা অনিয়ম। ২০২৪-এ অনুমতি দেওয়ার এক বছরের মধ্যে নাসিকের রিকশা ‘লাইসেন্স’ নবায়নকে পুঁজি করে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র।
২০২৪-এর জানুয়ারিতে প্রায় ১৭ হাজার প্যাডেলচালিত রিকশাকে ৫ হাজার টাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশায় রূপান্তরের সুযোগ দেওয়া হয় এবং এসব রিকশা প্রতি বছরে ১ হাজার ৫০ টাকায় সুযোগ দেওয়া হয় লাইসেন্স নবায়নের। অথচ ওই বছরের ডিসেম্বরে নাসিকের নাম্বার প্লেট জাল করে ব্যাটারিচালিত রিকশা-মিশুকের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এখন এসব অবৈধ রিকশা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে নাসিক। নবায়নের সুযোগ নিয়ে লাইসেন্স জাল করে সড়কে নামানো ৮০ হাজার মিশুক, অবৈধ অটোরিকশার মালিক-চালক থেকে ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই চক্রটি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ নাসিকও। ‘এক মালিককে এক লাইসেন্স, চালকেরও থাকতে হবে আলাদা লাইসেন্স’ নাসিকের এমন নীতিতে মুখোমুখি ব্যাটারিচালিত রিকশা-মিশুক মালিকরা।
নকল নাম্বার প্লেটের ছড়াছড়ি
১৭ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা লাইসেন্স নবায়নের করার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সিটি এলাকার সড়কে হলুদ রঙের রিকশা প্রবেশের। তবে রং পরিবর্তন ও নিবন্ধিত নাম্বার প্লেট নকল করে প্রায় ৮০ হাজার মিশুক-ব্যাটাারিচালিত রিকশা বর্তমানে চলছে সিটি এলাকায়। অসাধু অটোরিকশার মালিক ও বিশাল একটি সিন্ডিকেট প্রতিদিন বিভিন্ন নাম্বার প্লেট কপি করে একই লাইসেন্স নাম্বারের তৈরি করেছে কয়েকশ প্লেট। বিভিন্ন প্রিন্ট কারখানা থেকে এসব প্লেট কোড স্ক্যানার করে প্লাস্টিক আবরণে নকল বের করা হয়। সিটি করপোরেশন যেখানে দিয়েছে রিকশার লাইসেন্স, সেখানে ‘রিকশা’ শব্দটির ওপর ‘মিশুক’ লাগিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে অবাধে চলছে এসব। রেজিস্ট্রেশন নাম্বার প্লেটগুলো দেখতে প্রায় অভিন্ন হওয়ায় আসল-নকল চিহ্নিত করা অসম্ভব।
রূপান্তর ও লাইসেন্স, নাম্বার প্লেট জালিয়াতি
নাসিকের হিসাব অনুযায়ী, ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী মেয়র থাকাকালে নাসিকের নবম মাসিক সভায় সপ্তম আলোচ্যসূচিতে নগরীতে চলমান ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা লাইসেন্স-সম্পর্কিত আলোচনা হয় ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি। সে সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তিনটি পৌরসভার আমলে ইস্যু করা সর্বমোট ১৬ হাজার ৯৬৩টি লাইসেন্স করা রিকশাকে অনুমতি দেওয়া হয় বিদ্যুৎচালিত রিকশায় রূপান্তর করে চালানোর। এতে প্রায় প্রায় ১১ হাজার লাইসেন্স নবায়ন বাবদ বকেয়াসহ প্রায় ১১ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে নাসিক। রিকশা থেকে বিদ্যুৎচালিত রিকশায় রূপান্তর করতে রিকশাপ্রতি ৫ হাজার এবং নবায়ন করতে ফি নেওয়া হয় ১০২১ টাকা। তবে এরপর এই নবায়ন করা লাইসেন্সের একটি প্লেট নকল করে ব্যাপকহারে মিশুক, বিদ্যুৎচালিত রিকশায় লাগানো হয়। লাইসেন্সের এ নকল প্লেট প্রায় ৮০ হাজার বিদ্যুৎচালিত রিকশা-মিশুকে লাগানো হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় নাসিক।
লাইসেন্স বিক্রির হিড়িক
প্যাডেলচালিত রিকশাকে মিশুকে রূপান্তরের অনুমতি দেওয়ার পর একটি চক্র এ সুুযোগ কাজে লাগিয়ে ৫০ কোটি টাকার ‘লাইসেন্স ব্যবসা করেছে জানালেন রিকশাচালকরা। তখন থেকে সাধারণ রিকশাচালকদের কাছ থেকে এসব লাইসেন্স হাতছাড়া হয়ে যায়। এখন কয়েক ব্যক্তির হাতেই নাসিকের ৩০০-৪০০টি করে লাইসেন্স করা মিশুক রয়েছে। এখনো এসব লাইসেন্স মালিক থেকে মালিকে হাতবদল হয় অনেক টাকার বিনিময়ে। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রতিটি মিশুকের লাইসেন্সের দাম রয়েছে ৩৩-৩৬ হাজার, সিদ্ধিরগঞ্জে ২৫-২৬ হাজার, বন্দরের লাইসেন্সের দাম ১০-১২ হাজার টাকা। যদিও শুধু পুরনো প্যাডেলচালিত রিকশাকে বিদ্যুৎচালিত রিকশায় রূপান্তরের অনুমোদন দিয়েছিল নাসিক। মিশুক নামক যানের কথা বলা হয়নি। সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে নারায়ণগঞ্জ শহরে অন্তত ৫০০-এর বেশি এসব যানের নাম্বার প্লেটে দেখা যায়— লাইসেন্স প্লেটে ‘রিকশার লাইসেন্স’ লেখা অংশে ‘মিশুক’ শব্দটি আলাদাভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এত যে সিটি করেপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ রয়েছে, তা স্পষ্ট হয় ‘নবায়ন স্লিপে’ আলাদা করে ‘মিশুক’ লেখা স্ট্যাম্প সিল দেওয়ায়। মূলত এই সূক্ষ্ম কারসাজিতে ১৭ হাজার কনভার্ট বিদ্যুৎচালিত রিকশার নবায়ন লাইসেন্সকে পুঁজি করে ৮০ হাজারের বেশি অবৈধ ‘মিশুক’, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা’ নামিয়ে ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।
১৫০ জনের হাতে ৫ হাজারের বেশি লাইসেন্স
একজনকে একটি লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলা হলেও নাসিক রিকশা ও মিশুক মালিক ঐক্য সমবায় লিমিটেডের ১৫০ জন সদস্যের হাতে রয়েছে ৫ হাজারের বেশি লাইসেন্স। ২০২৪ সালে রিকশাকে মিশুকে কনভার্টের অনুমোদন দেওয়া হলেও সংগঠনটি সমবায় অধিদপ্তরে নিবন্ধিত হয় ২০২৬ সালে। সংগঠনটির সভাপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস জানিয়েছেন, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশন কখনোই চালকের লাইসেন্স দেয়নি। ১৫০ জনের বেশি মালিকের হাতে ৩০-৪০ হাজারের বেশি লাইসেন্স আছে। বর্তমানে সিটিতে চলে ৭০-৮০ হাজার অটোরিকশা। প্রকৃতপক্ষে ১৫ হাজার ৮৫১টির অটোরিকশার সচল নম্বর রয়েছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে কমিটি
এদিকে চলতি বছরের ৪ জুন নাসিক এলাকায় যানজট নিরসন, অবৈধ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নগরীর যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনয়নের জন্য আগে ইস্যু করা রিকশা, মিশুক, ভ্যান গাড়ির লাইনেন্স পুনঃ নবায়ন নিয়ে সুপারিশ ও নবায়ন কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য গঠন করা হয়েছে ১৫ সদস্যের কমিটি। এ কমিটির আহ্বায়ক নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. মঈনুল ইসলাম বললেন, ‘প্যাডেলচালিত রিকশা থেকে মিশুকে কনভার্ট, লাইসেন্স প্রদান এবং লাইসেন্স নবায়নের পুরো কাজটি করেছে লাইসেন্স বিভাগ। ২০২৪ সালে একজন মালিককে একটি লাইসেন্স এবং প্রত্যেক চালকের আলাদা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’
কমিটির সদস্য সচিব নাসিকের লাইসেন্স অফিসার সাজ্জাদ হোসেনের ভাষ্য, ‘১৭ বছর ধরে আমি এ দায়িত্বে ছিলাম না। ইলেকট্রিক মোটর যান রেজিস্ট্রেশন ও চলাচল-সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৩ অনুসরণ করে ২০২৪ সালে প্যাডেলচালিত রিকশা থেকে বিদ্যুৎচালিত রিকশায় রূপান্তরের অনুমোদন ও লাইসেন্স নবায়নের অনুমোদন দেয় নাসিক। রিকশা থেকে মিশুকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে যারা পুরনো মালিক ছিলেন তারাই সুযোগ পেয়েছেন।’ নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান জানালেন, ‘নাসিক এলাকায় নতুন করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নাম্বার প্লেট বা লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে একজনকে একটির বেশি দেওয়া হবে না। শুধু তা-ই নয়, লাইসেন্সধারী ব্যক্তিকেই নিজে গাড়ি চালাতে হবে। এ বিষয়ে তদারকির জন্য একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। যারা লাইসেন্স পাবেন, তাদেরকে একটি করে আইডি কার্ড দেওয়া হবে। এ কার্ডের নকশা ও নিয়ম কমিটিই নির্ধারণ করবে। এ বিষয়ে কমিটিকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।’




