কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন
২৩৬ কোটির স্টেশনে শুধু দুই লাউঞ্জ
- ৩৫ মাসেও তালাবদ্ধ ১৬ সুবিধা, ভোগান্তিতে পর্যটক
- আছে শুধু টিকিট কাউন্টার এবং আগমন লাউঞ্জ
- জনবল সংকটে অনিশ্চিত উন্নত সেবা

সংগৃহীত ছবি
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, আধুনিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। ঝিনুকের আদলে তৈরি ছয়তলা ভবন, সামনে দৃষ্টিনন্দন পানির ফোয়ারা, ভেতরে শপিং সেন্টার, রেস্টুরেন্ট, হোটেল ও মাল্টিপারপাস হল— পর্যটন নগরী কক্সবাজারের আইকনিক রেলস্টেশন ঘিরে এমনই ছিল স্বপ্ন। পরিকল্পনা ছিল, রাতে ট্রেনে এসে সকালে কক্সবাজারে নামবেন পর্যটকরা। স্টেশনের লকারে লাগেজ রেখে সারা দিন ঘুরবেন সৈকতসহ দর্শনীয় স্থানগুলো। সন্ধ্যায় আবার ট্রেনে চড়ে ফিরবেন ঢাকায়। কিন্তু ২৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেই স্বপ্নের স্টেশনে বাস্তবতা এখন ভিন্ন। উদ্বোধনের পর তিন বছর পার হতে চললেও চালু হয়নি পরিকল্পিত অধিকাংশ সেবা। যাত্রীদের ভরসা বলতে টিকিট কাউন্টার আর আগমন লাউঞ্জ— এই দুটি। অন্য ১৬টি পরিকল্পিত সেবার বেশিরভাগই পড়ে আছে তালাবদ্ধ।
২৯ একর জমিতে ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট জুড়ে নির্মিত স্টেশন ভবনটির বাহ্যিক সৌন্দর্যের সঙ্গে ভেতরের সেবার এই বৈপরীত্য চোখে পড়ার মতো। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর উদ্বোধনের পর একই বছরের ডিসেম্বরে শুরু হয় কক্সবাজারে ট্রেন চলাচল। এরপর সময় গড়িয়েছে, যাত্রী বেড়েছে, পর্যটকের আনাগোনাও রয়েছে; কিন্তু পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি স্টেশনটির অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা। ফলে পর্যটকদের লাগেজ রাখার মতো মৌলিক সুবিধাটিও নিশ্চিত করা যায়নি। কেউ ব্যাগ নিয়ে ঘুরছেন, কেউ খুঁজছেন বিকল্প ব্যবস্থা।
শুধু লাগেজের সমস্যাই নয়, যাত্রীসেবার নানা ঘাটতিও ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে চার জোড়া ট্রেনে চার হাজার থেকে ছয় হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। অথচ পুরো স্টেশনে টয়লেট রয়েছে মাত্র আটটি। স্টেশন কিংবা আশপাশে পানি কেনার দোকানও নেই। অপেক্ষমাণ কক্ষে পর্যাপ্ত ফ্যান না থাকায় গরমে কষ্ট করতে হচ্ছে যাত্রীদের। ভবনের বিভিন্ন অংশে ওঠানামার লিফটও বন্ধ থাকার অভিযোগ রয়েছে।
আবুল খায়ের নামের এক যাত্রীর ভাষায়, আইকনিক রেলস্টেশনে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, বাস্তবে তা নেই। বিশেষ করে অপেক্ষমাণ কক্ষে পর্যাপ্ত ফ্যান না থাকায় গরমে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
আরেক যাত্রী নুরুল ইসলামের অভিযোগ, পর্যটকদের ব্যাগ রাখার জন্য লকার থাকার কথা থাকলেও স্টেশনে এসে সেই সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। যাত্রী শাহাদাত হোসেনের ক্ষোভ, লকার, মানসম্মত হোটেলসহ অনেক সেবা এখনো চালু হয়নি। লিফটও বন্ধ।
অবকাঠামো আছে, ব্যবহার নেই
রেলওয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, স্টেশনটির ছয়তলা ভবনে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য রয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৭ বর্গফুট জায়গা। দ্বিতীয় তলায় ওয়েটিং রুম ও শপিং সেন্টার, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় হোটেল, পঞ্চম তলায় অফিস এবং ষষ্ঠ তলায় মাল্টিপারপাস হলের ব্যবস্থা রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার, ডরমিটরি, রেস্টহাউজ ও পার্কিং সুবিধা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব স্থাপনা চালু হলে যাত্রীসেবার পাশাপাশি বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকেও আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। বাস্তবে বড় অংশের ব্যবহার শুরু না হওয়ায় সেই সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
স্টেশনটির তৃতীয় তলায় রয়েছে ৩৯ কক্ষের একটি আধুনিক আবাসিক হোটেল ও ডাইনিং স্পেস। কিন্তু পর্যটকরা এখনো সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। স্টেশনমাস্টার জয়নাল আবেদীন জানিয়েছেন, ভবনে হোটেল, মার্কেট, লকার, হলরুম, রেস্টুরেন্টসহ নানা সুবিধা রয়েছে। এই সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এসব সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম মনে করছেন, অব্যবহৃত অবস্থায় দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে স্টেশনের অবকাঠামো ও সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপকূলীয় এলাকার আর্দ্রতা ও লবণাক্ত বাতাসের কারণে পাইপ, বাথরুম, পানি সঞ্চালনব্যবস্থা ও বিভিন্ন ফিটিংসের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তার মতে, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে বড় স্থাপনাটির ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জনবল সংকটে বন্ধ সেবা
স্টেশনটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু না হওয়ার পেছনে জনবল সংকটকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার জয়নাল আবেদীনের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় জনবলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে স্টেশন পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে পুরো ভবন উন্মুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাকর্মীর ঘাটতিতে অনেক সময় স্টেশন অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
বর্তমানে স্টেশনে চারজন স্টেশনমাস্টার, চারজন বুকিং সহকারী, পাঁচজন টিকিট কালেক্টর, তিনজন পোর্টার, ১২ জন পিম্যান ও ছয়জন গেটকিপার দায়িত্ব পালন করছেন। নিরাপত্তায় রয়েছেন আটজন জিআরপি সদস্য ও প্রায় ১২ জন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য।
জনবল ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি ট্রেনের স্বল্পসংখ্যাকেও স্টেশনটির কম ব্যবহারের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন জয়নাল আবেদীন। তার ভাষ্য, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ৩১ জোড়া ট্রেন পরিচালনার কথা থাকলেও বর্তমানে চলছে মাত্র চার জোড়া। ফলে বিপুল যাত্রী ধারণক্ষমতা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে নির্মিত স্টেশনটি সামর্থ্যের তুলনায় অনেক কম ব্যবহৃত হচ্ছে।
বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর উদ্যোগেও ধীরগতি
স্টেশনটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল রেলওয়ে। এ লক্ষ্যে ‘ইনভাইটেশন ফর প্রপোজাল ফর ইন্টিগ্রেটেড ফ্যাসিলিটি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অপারেশন অব কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন’ শীর্ষক পরিকল্পনায় দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তাব জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দফার সেই উদ্যোগও সফল হয়নি।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ জানুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হলেও ৬ এপ্রিল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আগ্রহী আটটি প্রতিষ্ঠানের কেউ প্রস্তাব জমা দেয়নি। পরে ৯ এপ্রিল রেল ভবনে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পোস্ট-প্রপোজাল সভা হয়। সেখানে ৫ কোটি টাকা অফেরতযোগ্য অগ্রিম, ১৫ কোটি টাকা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি, ইউটিলিটি বিলের জরিমানা, চুক্তি বাতিলের ধারা এবং চুক্তির মেয়াদ ১২ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর করার মতো বিভিন্ন শর্ত পরিবর্তনের প্রস্তাব ওঠে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সুজিত কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, প্রথম দরপত্রে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শিডিউল কিনলেও কেউ প্রস্তাব জমা দেয়নি। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কিছু শর্ত শিথিল রেখে নতুন দরপত্রের কাজ শুরু হয়েছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীনও স্বীকার করেছেন, এত বড় অবকাঠামো পরিচালনায় রেলের অতীত অভিজ্ঞতা নেই। তাই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ না দেখানোয় নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে দ্রুত স্টেশনটি চালুর চেষ্টা চলছে।
রাজস্বের সম্ভাবনা, অপেক্ষায় পর্যটন খাত
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব আছমা সুলতানা ও উপসচিব আবিদা সুলতানা গত ১৩-১৫ মে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন ও আইকনিক স্টেশন পরিদর্শন করেছেন। তাদের সরেজমিনে পরিদর্শন প্রতিবেদনে স্টেশনের অবকাঠামো, যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শপিং সেন্টার, হোটেল, মাল্টিপারপাস হল ও রেস্টুরেন্ট চালু করা গেলে যাত্রীসেবা বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ের সুযোগও তৈরি হবে।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলও স্টেশনটির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার ভাষ্য, আইকনিক স্টেশনটি লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রীসেবা সম্প্রসারণ ও বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা চালু করা গেলে পর্যটকদের সুবিধা বাড়বে, একই সঙ্গে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
গত ১ আগস্ট স্টেশনটি পরিদর্শন করে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। সেসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রেল খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলে স্টেশনটি সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।



