যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে শতবর্ষী গাছ এখন ‘বিজ্ঞাপনের খুঁটি’

যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের দুই পাশে থাকা শতবর্ষী রেন্ট্রি গাছগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে বিজ্ঞাপনের খুঁটি হিসেবে। গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে ও তার পেঁচিয়ে লাগানো হচ্ছে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন। এতে একদিকে মহাসড়কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছ। ইতিমধ্যে অনেক গাছ মারা গেছে। এ পরিস্থিতিতে গাছের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ৩৬ কিলোমিটার অংশের ঝিকরগাছা উপজেলা মোড়, হাসপাতাল রোড, থানার মোড়, হাজিরালী মহিলা কলেজ মোড়, চারাতলা ও গদখালী বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় গাছের গায়ে বিজ্ঞাপন লাগানোর এমন চিত্র দেখা গেছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, রাজনৈতিক সংগঠন, কোচিং সেন্টার ও ঘটক প্রতিষ্ঠানের প্রচারণামূলক সাইনবোর্ড ও ফেস্টুন ঝুলছে গাছের কাণ্ডে। একই চিত্র উপজেলার নবীননগর ও নাভারন পুরাতন বাজার এলাকাতেও।
কোথাও পুরোনো ফেস্টুন সরিয়ে নতুন ফেস্টুন লাগানো হয়েছে। আবার কোথাও একই গাছে ঝুলছে একাধিক বিজ্ঞাপন। এতে মহাসড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর স্বাভাবিক সৌন্দর্য অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে গাছকে বিজ্ঞাপনের খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হলেও এ প্রবণতা বন্ধে নিয়মিত ও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। কোনো সাইনবোর্ড বা ফেস্টুন সরানোর কিছুদিন পরই একই জায়গায় নতুন করে বিজ্ঞাপন লাগানো হচ্ছে। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
গাছের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পেরেক ও ধাতব বস্তু ব্যবহারের কারণে গাছের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, গাছের কাণ্ডে ক্ষত সৃষ্টি হলে সেখান দিয়ে পানি, জীবাণু ও অণুজীব প্রবেশ করতে পারে। এতে ধীরে ধীরে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সুস্থতা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের গাছ সংরক্ষণ নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৬ সালে মহাসড়কের দুই পাশে থাকা শতবর্ষী গাছ সংরক্ষণের দাবি ওঠে। পরবর্তী সময়ে মহাসড়ক সম্প্রসারণের সময় গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং গাছ ঝুঁকিতে পড়ার বিষয়টিও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।
বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী, গণপরিসরের সংজ্ঞায় সড়কের পাশও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনের ৯(১৩) ধারায় বাণিজ্যিক উৎপাদন ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পেরেক বা ধাতব বস্তু দিয়ে গাছের ক্ষতিসাধন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ বিধান লঙ্ঘনের জন্য আইনের ১০(৩) ধারায় সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনটি গত ৬ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ঝিকরগাছা অংশে মহাসড়কের পাশের গাছগুলোতে নতুন করে সাইনবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানো বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি যেসব গাছে পেরেক বা ধাতব বস্তু ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো অপসারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ নিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে কেউ গাছকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত নজরদারি ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বন অধিদপ্তরের ডেপুটি রেঞ্জার আরিফুল আলম জানিয়েছেন, গাছে পেরেক দেখলে তা সঙ্গে সঙ্গে তুলে ফেলার নির্দেশনা রয়েছে। তিনি মূলত শার্শা উপজেলার দায়িত্বে থাকলেও জনবলসংকটের কারণে বর্তমানে ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলাতেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। ঝিকরগাছার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
আরিফুল আলমের ভাষ্য, পৌরসভার অভ্যন্তরে গাছে লাগানো পেরেক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও ফেস্টুন পৌরসভা চাইলে অপসারণ করতে পারে।
যশোর জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার এম. এ. মনজু জানিয়েছেন, যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশের গাছগুলোর দেখাশোনার দায়িত্ব জেলা পরিষদের। গাছের গায়ে সাইনবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানোর বিষয়টি তারা অবগত আছেন। গাছে পেরেক মারা অপরাধ উল্লেখ করে তিনি জানান, এর আগে বৃক্ষপ্রেমী আব্দুল ওয়াহেদের মাধ্যমে গাছের গায়ে লাগানো ব্যানার ও পেরেক অপসারণ করা হয়েছিল। তবে এ ধরনের অভিযান পরিচালনার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা থাকা জরুরি।
ঝিকরগাছার সহকারী কমিশনার (ভূমি), নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পৌর প্রশাসক শপথ বৈরাগী জানিয়েছেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই এখনো সব বিষয়ে বিস্তারিতভাবে অবগত হতে পারেননি। পৌরসভায় বসার পর এ বিষয়ে আগে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি কী এবং কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।





