নিষেধাজ্ঞার জালে হাওরের জেলেরা
- বন্ধ থাকবে সব ধরনের মাছ আহরণ
- ব্যবস্থা করা হয়নি খাদ্য সহায়তার
- উদ্বেগ ও অসন্তোষ জেলেদের মাঝে

ফাইল ছবি
হাওরে পানি আসতে শুরু করেছে। বছরের এই সময়েই জাল কাঁধে নিয়ে জীবিকার আশায় জলে নেমে পড়েন সুনামগঞ্জের হাজারো জেলে; কিন্তু এবার সেই চিরচেনা দৃশ্যে পড়েছে বিরতি। মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো হাওরে এক মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। মৎস্যসম্পদ রক্ষার এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবিকা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে হাওরপাড়ের জেলে পরিবারগুলো।
জেলেদের অভিযোগ, মাছের প্রজনন রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা হয়নি তাদের। ফলে এক মাস কর্মহীন থেকে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা। অনেক জেলে পরিবার দৈনিক মাছ বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভরশীল। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে পরিবারে খাদ্য সংকটসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হবেন তারা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় বছরের বিভিন্ন সময় সাগর ও নদীতে দেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা। যদিও এ সময়ে নিবন্ধিত জেলেরা সরকারের তরফ থেকে পান খাদ্য সহায়তা। তবে হাওরে এই প্রথম দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এ কারণে জেলেদের আনা যায়নি খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থার মধ্যে। তবে কর্মসূচি সফল হলে আগামী বছর থেকে বিবেচনা করা যেতে পারে প্রণোদনার বিষয়টি।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, হাওরাঞ্চলে মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে ২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কার্যকর থাকা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ডিমওয়ালা ও পোনাসহ সব ধরনের মাছ আহরণ থাকবে বন্ধ।
তবে জেলেদের জন্য প্রণোদনা বা খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা না থাকায় উদ্বেগ ও অসন্তোষও দেখা দিয়েছে হাওরপাড়ে। ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরহাটি ইউনিয়নের বড়খলা গ্রামের জেলে আব্দুস সোবাহান জানালেন, বর্ষা মৌসুমে মাছ ধরা আয়ের প্রধান উৎস তাদের।
‘সরকার মাছের প্রজনন রক্ষার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটা ভালো। কিন্তু সহায়তা না পেলে সংসার চলবে কীভাবে, সেই চিন্তাও তো করতে হবে’— বললেন তিনি।
তার ভাষ্য, অনেক পরিবারেই রয়েছে খাদ্যসংকট। ফসলের ক্ষতির কারণে অনেকেই আগেই আছেন আর্থিক চাপে। এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় তাদের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
‘কেউ কেউ হয়তো কাজের খোঁজে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবেন’— যোগ করেন তিনি।
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন জামালগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৎস্যজীবী আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘কৃষকরা বিভিন্ন সময়ে সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা পেলেও জেলেদের জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ে না।
‘মাছের উৎপাদন বাড়াতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, এটা ভালো। কিন্তু এ সময়ে আমাদের পরিবার কীভাবে চলবে, সেটাও বিবেচনায় নেওয়া দরকার’— বললেন তিনি।
মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে মৎস্যজীবীর সংখ্যা ১ লাখ ২১ হাজার ৭৪৩ জন। এর মধ্যে নিবন্ধিত জেলে ৯২ হাজার ১৬৯ জন। জেলায় বছরে মাছ উৎপাদন হয় প্রায় ১ লাখ ১৭৭ টন। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাছ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে করা হয় সরবরাহ।
তবে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবারের কাছে এক মাসের নিষেধাজ্ঞা তৈরি করেছে জীবিকার সংকট। জেলেদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় অন্তত খাদ্য সহায়তা বা আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে পরিবারগুলো ন্যূনতম নিরাপত্তা পায়।
প্রশাসন বলছে, মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে এই পদক্ষেপ। বাজার ও হাওর এলাকায় চালানো হচ্ছে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও। ছোট মাছ ধরা ও বিক্রির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আল-মিনান নূরের ভাষ্য, হাওরাঞ্চলে মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমবার নেওয়া হয়েছে এই কর্মসূচি।
তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে জেলেদের জন্য কোনো প্রণোদনা বা খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা নেই। তবে কর্মসূচি সফল হলে আগামী বছর থেকে বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে সরকার।’ যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছের প্রজনন মৌসুমে আহরণ বন্ধ রাখা দীর্ঘমেয়াদে সহায়ক হতে পারে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধিতে। তবে এমন উদ্যোগ কার্যকর করতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে প্রশ্ন উঠছে— মাছ রক্ষার এই উদ্যোগ সফল হলেও, এক মাসের আয়হীন সময়টুকু কীভাবে পার করবে হাওরপাড়ের হাজারো জেলে পরিবার?




