কাপাসিয়া
সমতল জনপদে লাল মাটিতে চা চাষ!

‘কাপাসিয়া চা বাগান’ এখন স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে, ছবি: আগামীর বার্তা
চায়ের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিলেটের পাহাড়ি ঢাল, শ্রীমঙ্গলের সবুজ সমারোহ কিংবা পঞ্চগড়ের বিস্তীর্ণ চা বাগানের দৃশ্য। কিন্তু দেশের চা চাষের সেই প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিয়ে গাজীপুরের কাপাসিয়ার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এক চা বাগান। সমতলের লাল মাটির উঁচু-নিচু জমিতে প্রতিষ্ঠিত ‘কাপাসিয়া চা বাগান’ এখন স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
উপজেলার তরগাঁও ইউনিয়নের চিনাডুলি গ্রামে প্রায় এক দশক আগে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ অনেকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। একসময় পতিত জমিতে এখন সারিবদ্ধ চা গাছের সবুজ সমারোহ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সিলেটের কোনো ছোট্ট চা বাগান এসে জায়গা করে নিয়েছে গাজীপুরের সমতল জনপদে।
সরেজমিন দেখা যায়, বাগানের চারদিকে সবুজের শান্ত পরিবেশ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের আনাগোনা লেগেই থাকে। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ চা চাষ সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। স্থানীয়দের অনেকেই এটিকে কাপাসিয়ার নতুন দর্শনীয় স্থান হিসেবে দেখছেন।
বাগানের উদ্যোক্তা প্রফেসর লুৎফর রহমান দীর্ঘদিন ধরে চা চাষ নিয়ে গবেষণা ও আগ্রহের জায়গা থেকে এই উদ্যোগ নিয়েছেন। ২০১৫ সালের শেষ দিকে তিনি সিলেট থেকে চা গাছের চারা সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলকভাবে এক একর জমিতে চাষ শুরু করেন। প্রথমদিকে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্যোগ সফলতায় রূপ নেয়।
বাগানের ব্লক সুপারভাইজার মুসলে উদ্দিন জানান, চা চাষের জন্য পাহাড়ি পরিবেশ না থাকলেও কাপাসিয়ার লাল মাটির উঁচু জমিগুলো বেশ উপযোগী প্রমাণিত হলো। বৃষ্টির পানি না জমায় গাছের শিকড় দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। বর্তমানে বাগান থেকে নিয়মিত চা পাতা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রিও হচ্ছে।
তিনি বললেন, চা গাছের চারা উৎপাদনের জন্য এ এলাকার মাটি উপযুক্ত নয়। তাই শ্রীমঙ্গল থেকে চারা আনতে হয়েছে। তবে চা গাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদন আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে বাগানের পাতা ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে।
বাগান সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত চা পাতা প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চাহিদাও রয়েছে ভালো। ফলে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। চা গাছের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত আর্দ্রতা ও নিয়মিত বৃষ্টিপাত। কিন্তু কাপাসিয়ায় তুলনামূলক কম বৃষ্টি হওয়ায় সেচের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বর্তমানে গভীর নলকূপের মাধ্যমে বাগানে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন বজায় থাকলেও ব্যয় বাড়ছে।
প্রফেসর লুৎফর রহমানের ছোট ভাই মাহবুবুর রহমান রকেটের ভাষ্য, কাপাসিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় লাল মাটির উঁচু চালা জমি বছরের পর বছর পড়ে থাকে। এসব জমিতে চা চাষ করা গেলে লাভবান হবে কৃষক। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পরিবর্তন আসবে দেশের অর্থনীতিতে।
স্থানীয় কৃষকদের অনেকেই এই চা বাগান দেখতে আসছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের জমিতে চা চাষের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছেনও। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং বাজারজাতকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে সমতল অঞ্চলেও চা চাষ লাভজনক হতে পারে।
চা বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থী রমিজ উদ্দিন জানালেন, শ্রীমঙ্গল বা পঞ্চগড়ে না গিয়েও এখন চা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাচ্ছে। এটি শুধু একটি কৃষি উদ্যোগ নয়, কাপাসিয়ার জন্য গর্বের বিষয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আশিকুল ইমান শোয়েবের মতে, কৃষির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টির পাশাপাশি এই চা বাগান ভবিষ্যতে কৃষিভিত্তিক পর্যটনেরও একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পনা থাকলে কাপাসিয়ার এই ছোট্ট উদ্যোগ একদিন দেশের সমতল অঞ্চলে চা চাষের সফল মডেল হিসেবে পরিচিতি পাবে।




