কাবিখার কাজ কাগজে শতভাগ, বাস্তবে নেই

বকশীগঞ্জ কাবিখা প্রকল্পের রাস্তা
জামালপুরের বকশীগঞ্জে কাজের বিনিময়ে খাদ্যশস্য (কাবিখা) কর্মসূচির একাধিক প্রকল্পে কাজ না করেই শতভাগ বাস্তবায়ন দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।
কোথাও নামমাত্র কাজ হয়েছে, আবার কোথাও কাজই শুরু হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া মাস্টাররোল তৈরি করে কাগুজে কমিটির মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দের চাল-গম আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. হাবীবুর রহমান সুমন দাবি করেছেন, সব প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে এবং নিয়ম মেনেই তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বকশীগঞ্জে কাবিখা কর্মসূচির আওতায় সাতটি প্রকল্পে ৪৬ টন ২০০ কেজি গম এবং পাঁচটি প্রকল্পে ৩৪ টন ২০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত জুনের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে এসব প্রকল্প অনুমোদন করা হয়।
প্রকল্প সভাপতিদের স্বাক্ষরে খাদ্যগুদাম থেকে চাল ও গম উত্তোলনের পর ৩০ জুন প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্ধারিত সময় শেষ হয়।
সরেজমিনে উপজেলার উজান খেওয়ারচর ইকবালের বাড়ি থেকে হযরত আলীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে নামমাত্র মাটি ফেলতে দেখা গেছে। এ প্রকল্পে ৬ টন গম বরাদ্দ ছিল।
প্রকল্প সভাপতি ও মেরুরচর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য খোরশেদা বেগম বলেন, ‘আমার স্বাক্ষর নিয়ে পিআইও অফিসের লোকজন বরাদ্দের গম উত্তোলন করেছে। তারা কাজও কিছুটা করেছে।’
খেওয়ারচর বাবুর বাড়ি থেকে বাতেনের বাড়ি এবং খোকনের বাড়ি থেকে বাতেনের বাড়ি পর্যন্ত দুটি রাস্তা সংস্কারে মোট ১২ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের দাবি, এসব প্রকল্পে কোনো কাজই হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দা বাবু বলেন, ‘কাজ করতে কেউ আসেনি। বাধ্য হয়ে নিজেরা স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তার বড় বড় গর্তে মাটি কেটে ভরাট করেছি।’
ঘুগরাকান্দি মুন্দিপাড়া ব্রিজসংলগ্ন গোলাপের দোকান থেকে বাজার পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ৯ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দা সুজন, আলমাস ও কবীরের দাবি, এ প্রকল্পে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে।
ঘুগরাকান্দি হযরত আলীর বাড়ি থেকে আবুল খায়ের মাস্টারের বাড়ি মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ৭ টন গম এবং পূর্ব কলকিহারা নালুর দোকান থেকে বাঘাডোবা ধলা মাস্টারের বাড়ি হয়ে ফকিরপাড়া শান্তিনগর বাজার পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ছয় টন ২০০ কেজি গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সরেজমিনে দুটি প্রকল্পের কোথাও উল্লেখযোগ্য কাজের চিহ্ন দেখা যায়নি।
ওই তিন প্রকল্পের সভাপতি মোছা. ফরিদা বলেন, ‘স্থানীয় বিএনপির নেতারা প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো করেছেন।’ প্রকল্পের স্থান কোথায়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প কোথায় দেওয়া হয়েছে, সেটা বলতে পারছি না।’ তার দাবি, ‘দলীয়ভাবে প্রকল্প দেওয়ায় নেতারা কাজ করেছেন।’
বাঘাডোবা মাদ্রাসা থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ১০ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয়রা প্রকল্পটির স্থান চিহ্নিত করতে পারেননি।
প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘আমি ওই প্রকল্পের বিষয়ে কিছুই জানি না। ওটা আমার এলাকাও নয়।’
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, পিআইও কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভুয়া মাস্টাররোল তৈরি করা হয়েছে। এরপর বাস্তবে কাজ না করেই এসব প্রকল্পের বরাদ্দ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তবে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মানিক সওদাগর বলেন, ‘ইউপি মেম্বারেরা কমিটির মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে করেছেন। প্রকল্পের কাজে দলীয় নেতা-কর্মীরা জড়িত নন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন বলেন, ‘আমি প্রকল্পের বিষয়ে ডিটেইলস জানি না। আমাকে আপনি প্রকল্পগুলো দেন।’ এরপর প্রকল্পগুলোর নাম দেওয়া হয়।
পরে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি তো আমাকে কয়েক মিনিট আগে দিলেন। এসব দেখতে হবে। আপনি পিআইও’র সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
অভিযোগের বিষয়ে পিআইও মো. হাবীবুর রহমান সুমন বলেন, ‘আমার প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। নিয়মানুযায়ী কাজ করা হয়েছে।’



