ভূমধ্যসাগরে ইউরোপযাত্রা
১১ দিনেও সন্ধান মেলেনি নিখোঁজ ৭৩ বাংলাদেশির
- বাংলাদেশ দূতাবাসও জানে না পরিণতি
- নিখোঁজদের ১০ জনের বাড়ি হবিগঞ্জে
- এক বছরেও খোঁজ মেলেনি ৩৮ জনের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পরিবারে ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় মোফাজ্জল মিয়া। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিতেই কাঁধে চাপে সংসারের ভার। পড়াশোনা ছেড়ে কৃষক বাবার সঙ্গে কাজ করছিলেন ক্ষেত-খামারে। কিন্তু কাটছিল না সংসারের দৈন্য। হঠাৎ একদিন ইউরোপে গিয়ে ‘সোনার হরিণ’ ধরার প্রস্তাব পান এক দালালের কাছে। ১০ লাখ টাকা হলেই পৌঁছে দেওয়া হবে ইতালি— এমন প্রলোভনে সহজেই ফাঁদে পড়েন হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের চানপাড়ার এই যুবক। এরপর তাকে কবজায় নিয়ে ধাপে ধাপে ২৩ লাখ টাকা আদায় করে প্রতারকরা। পরিণতিতে ভূমধ্যসাগরে হারিয়ে গেছে স্বপ্ন, ১১ দিন ধরে মিলছে না খোঁজ। তার সঙ্গে ছিলেন আরও ৭২ বাংলাদেশি, তাদের পরিণতিও অজানা।
পরিবারের সদস্যরা জানালেন, মোফাজ্জলকে প্রথমে ১০ লাখ টাকায় লিবিয়া নিয়ে যায় দালাল। সেখানে তাকে তুলে দেওয়া হয় মানব পাচারকারী চক্রের হাতে। সেই চক্র ইতালি নেওয়ার জন্য দফায় দফায় নির্যাতন করে আরও ১৩ লাখ টাকা আদায় করে। এভাবে আট মাসে সব মিলিয়ে হাতিয়ে নেয় ২৩ লাখ টাকা। গত ৬ অক্টোবর এই যুবকের সঙ্গে আরও ৭২ বাংলাদেশিকে তুলে দেওয়া হয় একটি নৌযানে, গন্তব্য ইতালি। ওই সময় বাড়িতে শেষ কথা হয়েছিল মোফাজ্জলের।
মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মোফাজ্জলের মা ফাতেমা বেগম। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘ছেলেকে ইউরোপ পাঠানোর জন্য কোনো টাকা ছিল না। তাই সংসারে সচ্ছলতা আনার আশায় বিক্রি করা হয় শেষ সম্বল বাড়ি ও বসতি জমি। এতে না হওয়ায় ঋণ নেওয়া হয় উচ্চসুদে। প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা কিস্তি। এর সঙ্গে আরও পাঁচ ছেলেমেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে মানবেতর দিন কাটছে, অনেক দিন অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হয়।’
ভুক্তভোগীর বাবা তোফাজ্জল মিয়া বললেন, ‘দালাল চক্র প্রথম দুদিন বলেছে, আমার ছেলে সাগরে নৌবাহিনীর জাহাজে আটকা পড়েছে। এখন আর ফোন ধরে না। এত টাকা দিয়েও ছেলেটার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। এখন আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব, কে আমাদের রুটিরুজির ব্যবস্থা করবে?’
ইতালির উদ্দেশে নৌকায় ওঠার আগে মানব পাচারকারী চক্রের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করে মামা ও বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল মোফাজ্জলের। তিনি জানিয়েছিলেন, একটি নৌযানে দুই গ্রুপের ৭৩ বাংলাদেশি উঠেছেন। কোনো বিপদ না হলে দুই দিনের মধ্যে ইতালি পৌঁছে বাড়িতে যোগাযোগ করবেন। সেটিই ছিল তার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের শেষ কথা।
হবিগঞ্জের অন্তত ১০ জনসহ ৭৩ বাংলাদেশি নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে পাঁচ দিন পর থেকে ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ শুরু করেন আবুল কাশেম। গত বছর একই পথে ইতালি গিয়েছিলেন তিনি। দূতাবাস থেকে তাকে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি ৭৩ জনের কোনো দল ইতালিতে পৌঁছায়নি। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ক্যাম্পেও মোফাজ্জলের খোঁজ পাননি কাশেম।
তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি নিজে এই পথে গিয়ে বুঝেছি, কতটা মৃত্যুঝুঁকি। আত্মীয়-স্বজনকে এভাবে না যেতে অনুরোধ করি। তারপরও অনেকে আসার চেষ্টা করেন।’
এক বছর আগে নিখোঁজ হবিগঞ্জের ৩৮ বাসিন্দারও সন্ধান মেলেনি। নতুন করে নিখোঁজ হওয়া ৭৩ জনের মধ্যে হবিগঞ্জের অন্তত ১০ জন রয়েছেন। এরপরও থেমে নেই সাগরপথে ইউরোপযাত্রা। অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বিগ্ন সচেতন মহল। হবিগঞ্জের যারা রয়েছেন, তাদের অনেকে হাসান আশরাফ ওরফে হাসান মোল্লাকে টাকা দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে নিখোঁজ হবিগঞ্জের ৩৮ জনও তার মাধ্যমে গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় কয়েকটি মামলা হলেও দৃশ্যমান নেই কোনো অগ্রগতি।
ইউরোপে থাকা প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লিবিয়ার বেনগাজী ও তবরুক থেকে গ্রিসে এবং ত্রিপলি ও জোয়ারা থেকে ইতালিতে লোক পাঠায় মানব পাচারকারী চক্র। তাদের ভাষ্য, গত ৬ অক্টোবর ত্রিপলি থেকে ৭৩ জনকে নিয়ে একটি নৌযান সমুদ্রপথে রওনা হয়। লিবিয়ার সমুদ্রসীমা অতিক্রমের পর থেকেই নৌযানটির যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজ ৭৩ জনই বাংলাদেশি।
লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব রাসেল মিয়া বলেছেন, ‘বেনগাজী, তবরুক, ত্রিপলি ও জোয়ারা এলাকায় লিবিয়া সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই; এসব এলাকা চালায় মাফিয়া চক্র। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের যাওয়াও অনিরাপদ। লিবিয়া সরকারও এ বিষয়ে তথ্য দেয় না। আমরা পত্রপত্রিকার খবর দেখে ডিটেনশন সেন্টারগুলোয় খোঁজ নিই। কিন্তু তাতে লাভ হয় না। আগের ৩৮ জনেরও এখন পর্যন্ত সন্ধান মেলেনি।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জের সহসভাপতি বাহার উদ্দিন এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, দিনের পর দিন এভাবে মানুষ নিখোঁজ হচ্ছে। তাদের পরিবার পথে বসছে। মামলা হলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে এই অপরাধ আরও বাড়বে। তরুণদের বৈধ পথে বিদেশে পাঠাতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।



