এমপিদের সঙ্গে নেতাদের বিরোধ, ১৮ কোটির ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’!
- দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৮ উপজেলায় ৯০টি ইউনিয়ন পরিষদ
- আওয়ামী আমলে ইউপির চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নে ২০-৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হতো
- ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ হাতছাড়া হয়ে যাবে এই ভয়ে কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দলীয় সংসদ সদস্যদের যে মতবিরোধ রয়েছে, তা বেশ কিছু কর্মকাণ্ডে আগেই স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু ঠিক কী কারণে বিরোধ, তা বোঝা যাচ্ছিল না। এবার সামনে এলো সেটিও। জানা গেল, বিরোধের সূত্রপাত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষমতা নিয়ে। অর্থাৎ এই ক্ষমতা আহ্বায়ক কমিটির কাছে থাকবে, নাকি সংসদ সদস্যদের হাতে যাবে— সেটিই দ্বন্দ্বের মূল কারণ।
এরই মধ্যে আসন্ন ইউপি নির্বাচনের প্রার্থী নির্বাচনে উপজেলাভিত্তিক সার্চ কমিটি গঠন করেছে আহ্বায়ক কমিটি। যে বিষয়ে পুরোপুরি অন্ধকারে ছিলেন সংসদ সদস্যরা। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে মাঠে নেমেছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণের সংসদ সদস্যরা। বিরোধের কারণ খুঁজতে তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা বলছেন, ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ হাতছাড়া হয়ে যাবে- এই ভয়ে কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৮ উপজেলায় ৯০টি ইউনিয়ন পরিষদ। আওয়ামী লীগ আমলে একেকটি ইউপির চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়নের জন্য ২০-৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হতো। যদিও এই লেনদেন হতো গোপনে। এখন একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদের জন্য যদি গড়ে ২০ লাখ লেনদেন হয়, তাহলে ৯০টিতে অন্তত ১৮ কোটি টাকার লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে। পুরোপুরি অবৈধ এই লেনদেনের প্রত্যাশাই দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ স্পষ্ট করেছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া আগামীর সময়কে বললেন, ‘মনে হচ্ছে, এমপি সাহেবরা আমাদের সঙ্গে ধঁছাধঁছি (ধস্তাধস্তি) করতে চাচ্ছেন। আমরা এসবে নেই। বিএনপির মনোনয়ন বোর্ড আমাদের তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান ফোন করে বলেছেন। আমরা তালিকা করে মনোনয়ন বোর্ডে জমা দিব। উনাদের (এমপি) ইচ্ছা হলে উনারাও আলাদা করে জমা দেবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দল।’
একই প্রসঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘ওরা (আহ্বায়ক কমিটি) কারা? ওরা কেন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী ঠিক করবে? আমরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। আমরা এলাকার লোকজনকে চিনি-জানি। তারা কাউকে চেনে? তারা কীভাবে নমিনেশন দেবে? চাঁদাবাজি করার একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি করছে। আর কিছুই না।’
দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র এক সদস্য জানালেন, জেলা কমিটির সঙ্গে এমপিদের বিরোধের শুরু সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই। তিনি বলছিলেন, ইউপির মেম্বার-চেয়ারম্যান যদি কমিটির সমর্থিত অর্থাৎ এমপিদের বিরোধী কেউ হন, তাহলে এমপিরা সেটি মানবেন কেন? বলতে দ্বিধা নেই, আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো দলগুলোয় স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে টাকা-পয়সার লেনদেন হয়। এটি ওপেন সিক্রেট। এখানেও বিশাল অঙ্কের লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার কলেজ বাজারের এ জে চৌধুরী কলেজ মাঠে সমাবেশ করেন সরওয়ার জামাল নিজামসহ তিন এমপি। অন্য দুজন হলেন— চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের এনামুল হক এনাম ও চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার একাংশ) আসনের জসিম উদ্দিন আহমেদ। সমাবেশে যোগ দেন দক্ষিণের সাবেক আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান এবং নির্বাচিত হতে না পারা চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিনও।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিকে বাইরে রেখে হঠাৎ এ সমাবেশ নিয়ে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়। যদিও আহ্বায়ক-সদস্য সচিব ছাড়া কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য ওই সমাবেশে যোগ দেন। নিষিদ্ধ সংগঠনের সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের প্রতিবাদে সমাবেশের কথা বলা হলেও সংসদ সদস্যদের বক্তব্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় সমর্থনের বিষয়টিও উঠে আসে। এতেই মোটামুটি বিরোধের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যায়।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর নগরীর দোস্ত বিল্ডিংয়ে দলীয় কার্যালয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলসমর্থিত প্রার্থী যাচাই-বাছাই করে সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির জন্য উপজেলাভিত্তিক কমিটি গঠন করা হয়। যেগুলোকে সার্চ কমিটি বলা হচ্ছে। পরদিন কমিটির তালিকা বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ১০ দিনের মধ্যে সংক্ষিপ্ত তালিকা করে আহ্বায়ক কমিটির কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে তালিকা তৈরির আগে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শের কথাও বলে দিয়েছেন আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব।
সার্চ কমিটিতে আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্য পদে থাকা নেতাদের নিজ নিজ উপজেলায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বোয়ালখালী উপজেলায় আজিজুল হক চৌধুরী, পটিয়ায় রেজাউল করিম ও সাইফুদ্দিন সালাম মিঠু, আনোয়ারায় মোহাম্মদ রফিক, কর্ণফুলীতে আলী আব্বাস, চন্দনাইশে নুরুল আনোয়ার চৌধুরী, সাতকানিয়ায় জামাল হোসেন ও মুজিবুর রহমান, উত্তর সাতকানিয়ায় রাজীব জাফর চৌধুরী ও দেলোয়ার হোসেন, লোহাগাড়ায় আসহাব উদ্দিন চৌধুরী এবং বাঁশখালীতে গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরীকে কমিটির প্রধান করা হয়। প্রতিটি কমিটিতে তাদের সঙ্গে আরও দু-তিনজন করে রয়েছেন।
পটিয়ার সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে তার সংসদীয় আসনে চেয়ারম্যান-মেম্বার প্রার্থী নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া সমীচীন ছিল। এলাকায় কে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য? কার জনপ্রিয়তা আছে? কাকে নমিনেশন দিলে নির্বাচিত হতে পারবেন? নিশ্চয়ই এমপিদের চেয়ে জেলা কমিটির নেতারা বেশি জানবেন না। তারা কোন এখতিয়ারে সার্চ কমিটি গঠন করেন? তারা কি এমপিদের সঙ্গে কাউন্টার করতে চাচ্ছেন? তারা কাউকে নমিনেশন দিলেও এমপিরা সমর্থন না করলে কি ওই প্রার্থী জিতে আসতে পারবেন!’
সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বললেন, ‘কীসের আহ্বায়ক কমিটি! গত সংসদ নির্বাচনে অনেকে ধানের শীষের বিরোধিতা করেছেন। কেউ মোমবাতি আর কেউ জান্নাতির পক্ষ নিয়েছিলেন। এখন তারা নাকি ইউপির চেয়ারম্যান-মেম্বার বানাবেন! তো, জনগণ আমাদের ভোট দিয়ে এমপি নির্বাচিত করল কেন?’
সংসদ সদস্যরা কী বলছেন সেটা দেখার সময় আহ্বায়ক কমিটির নেই, বললেন মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া। তিনি বলছিলেন, ‘এমপি সাহেবরা তো বলেই দিয়েছেন, উনারাই নাকি একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি। নেতাকর্মীরা কি তাহলে আঁইট্টা কলা (আটিয়া কলা বা বিচি কলার আঞ্চলিক নাম)? আবার বলেছেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা নাকি তাদের ভোট দেয়নি। তাহলে উনারা কাদের ভোটে জিতেছেন? লাখ লাখ ভোট কীভাবে পেয়েছেন? গাল একটা আছে, যা ইচ্ছা তা-ই বলছেন।’



