সাতসকালে প্যারেড মাঠে নির্মল বাতাস সেবন

ভোরের পূর্বাকাশে উঁকি দেওয়া সূর্যের আভা ছড়িয়ে সুন্দর সকালের আবাহন। কোমল আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। এই গরমেও মৃদু বাতাসে হালকা শীতলতা অনুভূত হচ্ছে। চারপাশের পরিবেশ নির্মল, কিন্তু মানুষের আনাগোনায় প্রাণবন্ত।
আজ শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সাধারণত এমন সকালে অনেকেই ঘুমের আরামে আরও কিছুটা সময় কাটাতে চান। কিন্তু নগরের কেন্দ্রে বিশাল ময়দানে তখন ভিন্ন এক দৃশ্য।
চট্টগ্রাম কলেজের প্যারেড মাঠ ভোর থেকেই মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। চারপাশে রয়েছে ওয়াকওয়ে। কেউ দ্রুত পায়ে হাঁটছেন, কেউ হালকা দৌড়ে ঘাম ঝরাচ্ছেন, কেউ খোলা আকাশের নিচে ব্যায়ামে ব্যস্ত। ছোট ছোট দলে গল্প করতে করতেই হাঁটছেন প্রবীণরাও।
শুধু প্রাতঃভ্রমণ নয়, এ মাঠ সকাল-বিকেল মুখরিত থাকে শিশু, কিশোর ও তরুণদের পদচারণায়। কখনো ফুটবল, কখনো ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকে তারা। তবে চলমান বিশ্বকাপের কারণে এখন ফুটবলের দিকেই ঝুঁকেছে কিশোর-তরুণদের দল। খানাখন্দে ভরা মাঠটি অসমতল। মাঝেমধ্যে ছোট-বড় গর্তও রয়েছে। তবু ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী এসব তরুণসহ সব বয়সী মানুষের খেলাধুলা ও হাঁটাহাঁটির একমাত্র ভরসা এই মাঠ।
চট্টগ্রাম কলেজের বালুময় বিশাল এই প্যারেড মাঠের দক্ষিণ দিকে কলেজের পুরোনো ছাত্রাবাস। উত্তর পাশ দিয়ে চলে গেছে চকবাজারের ব্যস্ত সড়ক, পূর্বদিকে চকবাজার থেকে সিরাজউদ্দৌলা সড়ক। মাঠের সামনের রাস্তাটির নাম কলেজ রোড, যার গন্তব্য গণিবেকারি মোড়।
নিয়মিত হাঁটতে আসা মানুষদের অনেকেই একে অপরের নাম জানেন না। তবু প্রতিদিনের দেখায় গড়ে উঠেছে পরিচয় ও সখ্য। হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে চলে কুশল বিনিময়, হাসি-ঠাট্টা। খেলাধুলা, রাজনীতি-সহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা। আজাদ বুলবুল, আমির খান ও আকতার কামাল চৌধুরী—তিনজনে মিলে এক কোণে বসিয়েছেন গানের আসর। গিয়ে তাদের পাশে বসে পড়লাম। তারাও সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন।
কথা হয় আজাদ বুলবুলের সঙ্গে। তিনি কবি ও লেখক। বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ‘হালদা’র কাহিনি রচনা করেছেন তিনি। আমির খান বাউল গান করেন, আবার কবিও। আকতার কামালও পত্রিকায় কলাম লেখেন। একটু গান, একটু আড্ডা—এভাবেই চলছিল তাদের আলাপন।
মাঠের চারপাশে যখন এক প্রজন্ম স্বাস্থ্যসুরক্ষায় হাঁটাহাঁটি ও দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত, তখন মাঝমাঠে ফুটবল ও ক্রিকেটে মেতেছে শিশু, কিশোর ও তরুণদের দল।
মায়ের সঙ্গে আর্জেন্টিনার জার্সি পরে প্যারেড মাঠে এসেছে তুহিন। ভেতরে ঢুকেই দৌড় দিল মাঝমাঠের দিকে। সমবয়সী কয়েকটি ছেলের সঙ্গে নেমে পড়ল ফুটবল খেলায়। মা মরিয়ম আক্তার বললেন, ‘ডায়াবেটিসের কারণেই মূলত হাঁটাহাঁটি করি। অন্যান্য দিনে ছেলেমেয়েদের স্কুল ও স্বামীর চাকরি থাকায় সকালে আসা না হলেও বিকেলে ছেলেকে নিয়ে আসি। আজ ছুটির দিনে ব্যস্ততা কম থাকায় সকালে এলাম।’
তবে ছুটির দিনের বাইরে অন্য দিনগুলোতে সকাল গড়াতেই বদলে যায় মাঠের রূপ। চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থীদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পায় চারপাশ। মাঠের পাশের বেঞ্চগুলো, রাস্তার ধারে কিংবা গাছের ছায়ায় বসে চলে বন্ধুদের আড্ডা, ক্লাসের আলোচনা, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন বোনা। কেউ বই খুলে বসেন, কেউ ছবি তোলেন, আবার কেউ কেউ গল্প করেই কাটিয়ে দেন অবসর।
এর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, একই মাঠ দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ধারণ করে অনেক রূপ। সকালে স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যস্ততা, দুপুরে কলেজ শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, বিকেলে পাড়ার ছেলেদের দলবেঁধে খেলার প্রতিযোগিতা, সন্ধ্যায় কর্মব্যস্ত শহুরে মানুষের হাঁটাহাঁটি—স্বাস্থ্যচর্চার এই উন্মুক্ত উদ্যানের নাম প্যারেড ময়দান।
কেন প্যারেড ময়দান? ইতিহাস গবেষক আব্দুল হক চৌধুরীর ‘বন্দর শহর চট্টগ্রাম’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে গোরা সিপাহীরা এখানে প্যারেড বা কুচকাওয়াজ করত বলে এর নাম হয় ‘প্যারেড ময়দান’। এখানে চল্লিশের দশকে মহররম উপলক্ষে চুঁয়া (চুঙ্গা) খেলার প্রতিযোগিতাও হতো।




