মূল বই ছেড়ে গাইডে বেশি মনোযোগ

আন্দরকিল্লা বই মার্কেট থেকে গাইড বই বিক্রি হচ্ছে। ছবি- রনি দে
সকালে বাসা থেকে ব্যাগভর্তি বই নিয়ে স্কুলে ছোটে শিক্ষার্থীরা। এত বইয়ের ওজনে ভারী ব্যাগ শিক্ষার্থীর পাশাপাশি অভিভাবকরাও বহন করতে বাধ্য হন। টানা পড়াশোনার পর, ভারী ব্যাগ বহনের এই চিত্র সব স্কুলে শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে হুবহু একইরকম।
মূল বইয়ের চেয়ে অনেক সময় বেশি জায়গা দখল করে রঙিন গাইড বই। কেউ বলে পথ দেখানো, কেউ বলে অপরিহার্য। আবার কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ‘গাইড ছাড়া এখন আর লেখাপড়া চালানো দায়।’
একসময় গাইডের চেহারা ছিল দেখতে মোটাসোটা যেন এক বালাম খাতা। এখন দিন বদলেছে, বদলে গেছে গাইডের ধারণাও। প্রতি বিষয়ের জন্য বাজারে পাওয়া যায় বিষয়ভিত্তিক গাইড বই। অর্থাৎ আকারে ছোট।
শিক্ষার আঙিনা যেন ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চার চেয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে। তবে কি গাইড বই এখন মূল বইকেই আড়াল করে দিচ্ছে? একদিকে অতিরিক্ত বইয়ের চাপে সৃজনশীলতা হারাচ্ছে শিক্ষার্থী, অন্যদিকে অভিভাবকদের ওপর পড়ছে বাড়তি খরচের চাপ। দুইয়ের মধ্যে বসে গাইড বই বিক্রি করে বছরে হাজার কোটি টাকা আয় করছে প্রকাশনী সংস্থাগুলো।
গাইড বই না কিনলে কার ক্ষতি? প্রশ্ন রেখেছিলাম অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া কাস্টমস ল্যাবরেটরি স্কুলের (চট্টগ্রাম) লাবিবের মায়ের কাছে। তিনি বললেন, ‘মূল বইয়ে উত্তর থাকে না। রিডিং পড়ে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাও কষ্টসাধ্য। বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান বিষয়ের আলাদা গাইড কিনতে হয়। স্কুল থেকেই দেওয়া হয় এসব গাইডের লিস্ট। সেখানেই লেখা থাকে কোন প্রকাশনীর কোন বইটি কিনতে হবে। না কিনলে সন্তান পিছিয়ে পড়বে এটাই ভয়।’
শিক্ষার্থী লাবিবের ভাষ্যও মায়ের মতোই, ‘পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে গাইডের প্রশ্ন ও সাজেশনই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মূল বইয়ের গভীরে যাওয়ার চেয়ে গাইডের সংক্ষিপ্ত উত্তরই বেশি সহজ। মূল বই থেকে যে পড়াগুলো সহজে পাওয়া যায় না, সেগুলো গাইড বইয়ে সাজানো ও সংক্ষিপ্তভাবে থাকে। মুখস্তনির্ভর পরীক্ষার জন্য গাইড বই অনেকাংশেই অপরিহার্য হয়ে গেছে।’
শিক্ষার্থীর এমন ভাবনার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় চকবাজারের বই দোকানি আবদুল হান্নানের কথায়। তিনি জানালেন, ‘সারা দিন যা বই বিক্রি করি তার অর্ধেকই থাকে বিভিন্ন ক্লাসের গাইড বই। লাভও হয় বেশি।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী স্মৃতি চৌধুরী জানালেন, শিক্ষকরাই ক্লাসে গাইড অনুসরণ করে পড়াচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট গাইড কিনতেও নির্দেশ দেন। স্কুলের পরীক্ষাগুলোয় বেশিরভাগ সময় গাইডের প্রশ্নই এদিক-সেদিক করে তুলে দেওয়া হয়। যেমন- কখনো ১ নং সৃজনশীলের ক, খ-এর সঙ্গে ১০ নং সৃজনশীলের গ, ঘ নিয়ে কাটছাঁট করে বানিয়ে ফেলা হচ্ছে নতুন সৃজনশীল প্রশ্ন, যা দেওয়া হচ্ছে পরীক্ষায়। আবার এমন অনেক শিক্ষক আছেন যারা কোনো পরিশ্রম ছাড়াই গাইড দেখে হুবহু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বানাচ্ছেন। মূলত এ কারণেই শিক্ষার্থীদের কাছে গাইডের চাহিদা।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ তজল্লী আজাদ বলছেন, ‘গাইড পড়লে সৃজনশীল মনোভাব জাগ্রত হবে না। আমাদের শিক্ষকরা ক্লাসে গাইড দেখে পড়ায় না। শিক্ষার্থীদেরও নিরুৎসাহিত করি গাইড পড়তে। গাইড থেকে যেন কোনো শিক্ষক প্রশ্ন না করে সেই বিষয়েও শিক্ষকদের সর্তক করি।’
নামকরা এই স্কুলের শিক্ষক প্রশ্ন তুললেন, সবসময় শুনি গাইড বন্ধ করে দেওয়া হবে। তাহলে বাজারে এই গাইড আসে কোথা থেকে?
এদিকে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন সংস্করণের গাইড ও সাপ্লিমেন্ট নিয়ে আটঘাট বেঁধে বাজারে নামে। বছর জুড়ে প্রতিটি পরীক্ষার পর (অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক, বৃত্তি) ছাত্র-ছাত্রীদের আকৃষ্ট করার জন্য চলে নানা বিজ্ঞাপন। ‘শতভাগ কমন’, ‘সেরা সাজেশন’, ‘পরীক্ষার শেষ প্রস্তুতি’— এ রকম নজরকাড়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলতে থাকে।
ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহেদা আক্তারের ভাষ্য, ‘ক্লাসে শিক্ষকদের মূল কাজ শিক্ষার্থীদের ভাবতে শিখানো। স্বনির্ভর হতে সাহায্য করা। গাইড তো সেই সুযোগ দেয় না। এটি শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীল করে রাখে।’




