মদে বাড়ছে রাজস্ব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমদানি পণ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ শুল্ক কোন পণ্যে জানেন? উত্তর হচ্ছে- অ্যালকোহল, বিয়ার। যেই পণ্য আনতে লাগে অনুমতি, বিক্রিতে কড়াকড়ি আর ব্যবহার করতে হয় শর্ত সাপেক্ষে। ৬৫০ শতাংশের বেশি শুল্ক দিতে হয়। শুল্কের সঙ্গে যোগ করতে হয় সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট।
অর্থাৎ এক হাজার টাকার একটি পণ্যের ওপর ৬০০-৭০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক, এরপর আবার ৩৯ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়ে শুল্কায়নের পর মূল্য দাঁড়ায় ১০ হাজার টাকা। এমন আজব শুল্ককাঠামো বাংলাদেশে আর কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে নেই।
দেশে নিয়ন্ত্রিত এবং শর্তসাপেক্ষে আমদানি ও পানের অনুমতি আছে অ্যালকোহলের। অনুমোদিত বার ছাড়া প্রকাশ্যে খাওয়া যায় না।
যাত্রী হিসেবে বিদেশ থেকে আনারও সুযোগ নেই। অনুমোদিত বার ছাড়া প্রকাশ্যে খেতে গেলেও আছে মামলার ভয়। এত কড়াকড়ি ও উচ্চ শুল্কের পরও দেশে বৈধপথে অ্যালকোহল বা মদ আমদানি বেড়েছে। বিপরীতে সরকার পাচ্ছে বেশি রাজস্ব। পাঁচ মাসে অ্যালকোহল আমদানিতে সরকার ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে। বছর শেষে সরকারের সম্ভাব্য মোট রাজস্ব আয় ৭০০ কোটি টাকা ছাড়াবে।
তবে এর বিপরীতেও অনেক কথা চালু আছে বাজারে। উচ্চ শুল্কের কারণে চোরাচালান হচ্ছে সমানে। দেশের বিভিন্ন হোটেল ও বারে যে অ্যালকোহল-বিয়ার বিক্রি হয় তার অধিকাংশই চোরাপথে ঢুকে। কারণ অস্বাভাবিক আমদানি শুল্ক দিয়ে এ ব্যবসায় টিকে থাকা অসম্ভব। সে কথাই জানাচ্ছেন বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের পুরোধা হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাকিম আলী। তিনি বললেন, ‘যত না আমদানি হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি চোরাই পথে ঢুকছে হোটেল-মোটেল ও বারে। প্রতিবেশী দেশের কলকাতা শহরে যেখানে একটি বিয়ার এক-দেড় ডলারে (১২৫ টাকা) বিক্রি হয়, সেখানে বাংলাদেশে বিক্রি হচ্ছে ১০-১৫ ডলারে। সে কারণে আমাদের দেশে ইয়াবার এত রমরমা ব্যবসা। কলকাতায় কিন্তু ইয়াবা নেই। আমাদের সরকার পর্যটন ও বিনোদনের স্বার্থে এ খাতে শুল্ক কাঠামো সহনীয় করে তুললে সরকার রাজস্ব যেমন পাবে, তেমন আমাদের নতুন প্রজন্মের ইয়াবা খাওয়াও বন্ধ হবে।’
আমদানি বাড়ার তথ্য মিলেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসেবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অ্যালকোহল স্পিরিট আমদানি হয়েছে সাড়ে ৮৮ হাজার লিটার। মে মাসে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার লিটার। জানুয়ারিতে বিয়ার আমদানি হতো ১ লাখ ৪৫ হাজার লিটার। মে মাসে সেটি প্রায় দুই লাখে উন্নীত হয়েছে। জানুয়ারির তুলনায় মে মাসে অ্যালকোহল স্পিরিটের আমদানি বেড়েছে প্রায় ১৮.৬৪ শতাংশ এবং বিয়ারের আমদানি উল্লেখযোগ্যহারে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৯৩ শতাংশ।
মূলত বাংলাদেশে বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিদেশি কর্মকর্তা, দেশের মেগা প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি কর্মকর্তা, করপোরেট এক্সিকিউটিভ ও কিছু বিদেশি পর্যটক এই অ্যালকোহলের ক্রেতা। এর বাইরে দেশের মাঝারি ও উচ্চ আয়ের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীরা এর গ্রাহক।
চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে কাস্টমসের সহকারী কমিশনার শুভ্রদেব মন্ডল বলেছেন, চোরাচালান বা মিথ্যা ঘোষণায় যে কৌশলে অ্যালকোহল আনা হতো সেই রুটে কড়াকড়ির কারণেই বৈধপথে আমদানি বেড়েছে। আর ব্যাগেজ রুলসে একটি বিদেশি পাসপোর্ট এক লিটার অ্যালকোহল আনতে পারেন। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীর সেই সুযোগ নেই। কেউ আনলেও আমরা সেটি জব্দ করি। ফলে অ্যালকোহলের চাহিদা বৈধপথেই মেটাচ্ছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে ১২ লাখ ৭৬ হাজার লিটার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ ও বিয়ার আমদানি হয়েছে। এসব মদ বিয়ারের কাস্টমস শুল্কায়িত মূল্য সাড়ে ৫৪ কোটি টাকা।
৪ লাখ ৭৬ হাজার লিটার অ্যালকোহল আমদানি হয়েছে। যার শুল্কায়ন মূল্য প্রায় ৫৩ কোটি টাকা। বিয়ার আমদানি হয়েছে ৮ লাখ লিটার। শুল্কায়ন মূল্য ১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১২৫ কোটি টাকার এই তিন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে। এর ওপর শুল্ক নির্ধারণ হবে। শুল্ক শূন্য হবে কূটনীতিক কোটায় আনা অ্যালকোহল।
এমন বাস্তবতায় দেশে বৈধভাবে অ্যালকোহল আমদানির শুল্কহার আগামী বাজেটে তিনভাগের একভাগ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। বিয়ার আমদানিতে শুল্কভার ৪৪২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫০ শতাংশ। ব্র্যান্ডি, হুইস্কি, রাম, জিন, ভদকা ও অন্যান্য লিকুয়ারে কর ৬১১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শুল্ক কমানো হলে দেশে অবৈধ অ্যালকোহল আমদানি কমবে ও বিদেশি অ্যালকোহল বেশি আসবে। একই সঙ্গে বাড়বে সরকারের রাজস্বও। তবে এনবিআর বলছে, কেবল রাজস্ব নয়, প্রস্তাবনাটি আমলে নেওয়ার আগে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাবকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।




