অবৈধ সিগারেট ঠেকালে ২০ হাজার কোটি আয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে অবৈধ সিগারেটের বিস্তার ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বাজার বিশ্লেষক ও উৎপাদকরা জানাচ্ছেন, কর ফাঁকি দিয়ে দেশে তৈরি ও বাজারজাতকরণ এবং চোরাচালানের অবৈধ সিগারেটের কারণে প্রতিবছর সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
শুধু গত ছয় মাসেই এই অবৈধ সিগারেটের বাজার বেড়েছে ৩১ শতাংশ। পাড়া-মহল্লা, গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি হাট-বাজারে ছেয়ে গেছে বিদেশি, নকল ও নিম্নমানের ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া সিগারেট। এর মধ্যে নকল ও বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে দেশের মোট সিগারেট বাজারের প্রায় ১৩ শতাংশই অবৈধদের দখলে। প্রতি মাসে প্রায় ৮৩ কোটি ২০ লাখ শলাকা অবৈধ সিগারেট দেশের বাজারে প্রবেশ করছে, যা বার্ষিক হিসাবে ১ হাজার কোটি শলাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে নিয়মিত ভ্যাট দেওয়া বৈধ দেশীয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব সংকট চরমে।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় দেশের শীর্ষস্থানীয় তিন উৎপাদক প্রতিষ্ঠান-বিএটিবি, জেটিআই এবং আবুল খায়ের টোব্যাকোর প্রতিনিধিরা এই অবৈধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এই অবৈধ সিগারেট অবিলম্বে বন্ধ করা না গেলে বৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, ব্রাজিল বা অস্ট্রেলিয়ার মতো বাংলাদেশের সিগারেট খাতও সম্পূর্ণভাবে চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
এনবিআর কঠোর হলে এই চক্র দমন সম্ভব, তার বাস্তব প্রমাণ মিলেছে গত বছর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে কড়া নজরদারি ও প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার লাগাতার অভিযানের কারণে অবৈধ সিগারেট বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছিল। ফলে জুলাই ২০২৫-এ বিএটিবি’র দেওয়া রাজস্বের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৭০১ শতাংশ, জেটিআই’র প্রায় ২০০ শতাংশ এবং আবুল খায়ের টোব্যাকোর প্রায় ১০০ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এনবিআর সিগারেট খাত থেকে রেকর্ড ১৫ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় করে, যা আগের বছরের চেয়ে ৬১ দশমিক ৮১ শতাংশ বেশি। তৎকালীন মেম্বার (ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি) বেলাল হোসাইন চৌধুরীর নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ের আড়াই হাজার কর্মকর্তা মোট ১৩ হাজার ৪০৯টি সফল অভিযান পরিচালনা করেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬২১টি অভিযান হয় সিলেট কমিশনারেটে।
তবে গত সেপ্টেম্বরের পর আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এই অভিযান। এরপর ‘অবৈধ সিগারেট সিন্ডিকেট’ দ্বিগুণ গতিতে বাজারে ফিরে। চলতি বছরের মে মাসে ভ্যাট আদায় কমেছে ১ হাজার ৫২১ কোটি টাকা, গত বছরের একই মাসের তুলনায় সিগারেট খাতে। প্রথম চার মাসের বিশাল প্রবৃদ্ধির পর পরবর্তী মাসগুলোতে ভ্যাট আদায়ের গতি মন্থর হয়ে ৪২২ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে আদায় হয়েছে ৪০ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৭ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা।
মূলত তিনটি উপায়ে এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। দেশের ভেতরের অবৈধ কারখানায় জাল বা পুরনো ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল দিয়ে তৈরি সিগারেট। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিমানবন্দর ও সীমান্ত দিয়ে আনা নামি ব্র্যান্ডের সিগারেট। বাজারে প্রচলিত জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর প্যাকেট হুবহু নকল করে নিম্নমানের তামাক দিয়ে তৈরি করা সিগারেট।
বাজার দখলে রাখতে এই চক্র খুচরা বিক্রেতা ও দোকানদারদের অতিরিক্ত কমিশন, ফ্রি পণ্য ও নগদ ইনসেনটিভের মতো বিশেষ ‘অফার’-এর ফাঁদ পেতেছে। সমীক্ষা বলছে, দেশের প্রায় ৮২ শতাংশ দোকানদার এই অবৈধ সিগারেটের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাচ্ছে।
তামাক খাতের অবৈধ সিন্ডিকেট কতটা শক্তিশালী, তার প্রমাণ মেলে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর। অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া ভ্যাট মেম্বার বেলাল হোসাইন চৌধুরীকে আকস্মিক বদলি এবং ৯ অক্টোবর ওএসডি করা হয়।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, একটি বেনামি অভিযোগের ভিত্তিতে তথ্য বিকৃতি করে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ঘটনার পর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাহস ও মনোবলে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এই খাত নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মতে, সনাতন বা ম্যানুয়াল পদ্ধতি দিয়ে এই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সিন্ডিকেট দমন সম্ভব নয়। অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সাতটি আধুনিক সংস্কার প্রস্তাব করেছেন তারা। এর মধ্যে রয়েছে, উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করা। প্রতিটি সিগারেট প্যাকেটে বাধ্যতামূলক কিউআর কোড সংযোজন। ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাল ব্যান্ডরোল শনাক্তকরণ। এনবিআর, কাস্টমস ও পুলিশের সমন্বয়ে সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন। এআই ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালু করা। নিম্ন আয়ের ধূমপায়ীরা যাতে সস্তা অবৈধ সিগারেটের দিকে না ঝুঁকে, সেজন্য কর কাঠামোর যৌক্তিক সংস্কার। অভিযানে অংশ নেওয়া সৎ কর্মকর্তাদের আইনি ও প্রশাসনিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।
অর্থনীতিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবৈধ সিগারেট শুধু বিপুল রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়, বরং মাননিয়ন্ত্রণহীন ও ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত উপাদান ব্যবহার করায় জনস্বাস্থ্যের জন্যও এক চরম হুমকিও বটে।




