সন্দ্বীপে হাসপাতালে মেলে না সাপে কাটার ইনজেকশন

প্রতীকী ছবি
সারিকাইত ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. বাবলু গত ১৯ জুন সন্ধ্যায় মাছ ধরতে গেলে সাপে কাটে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় দুজন ওঝার কাছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে নেওয়া হয় সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতাল থেকে একটি স্লিপে লিখে দেওয়া হয় অ্যান্টিভেনম নিয়ে আসতে। পরে হাসপাতালের বাইরের দোকান থেকে এনে অ্যান্টিভেনম বাবলুকে দেওয়া হয়।
ওষুধ প্রয়োগের পর তার খিচুনি দেখা দেয়। পরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। রাত ২টায় সন্দ্বীপ চ্যানেল পার হলেও চমেক হাসপাতালে পৌঁছার আগেই বাবলুর মৃত্যু হয়।
এভাবে গত ছয় মাসে ৩৬ জনকে সাপে কেটেছে সন্দ্বীপ উপজেলায়। এতে কতজন মারা গেছেন তার কোনো তথ্য সরকারি হাসপাতালটিতে নেই। সাপে কাটার পর যেসব রোগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েছিলেন, শুধু তাদের তথ্যটি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
সাপে কাটার প্রতিষেধক ইনজেকশনের (অ্যান্টিভেনম) অপ্রতুলতা, ওঝা নির্ভরতা, যোগাযোগ সমস্যা, সর্বোপরি চিকিৎসক অনুপস্থিতির কারণে সন্দ্বীপের সাপে কাটা রোগীরা সংকটে পড়ছেন। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে অহরহ।
এই যেমন ২০ জুন, কাছিয়াপাড়া হারামিয়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. শাহাদাতকেও সাপে কাটে। তাকে আর চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ওখানেই মারা যান শাহদাত। দুদিনে সাপে কাটায় দুজনের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম থাকার পরও না দেওয়ার অভিযোগ করেন অনেকে। একেকটি অ্যান্টিভেনম ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় কিনতে হয়।
সারিকাইতের বাবলুকে সাপে কাটার সময় সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় জাইফুল। তিনি জানান, রাত সাড়ে ১১টায় বাবলুকে ইনজেকশন দেওয়া হয়। রাত ২টায় তাকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। হাসপাতাল থেকে যদি ইনজেকশন দিত তাহলে আরও আগে চিকিৎসা শুরু করা যেত। চিকিৎসক আসতে দেরি করা, ইনজেকশন কিনে আনাসহ নানা কারণে সময়ক্ষেপণ হয়। ফলে তাকে বাঁচানো যায়নি।
চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোয় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা এখনো দ্বীপবাসীর অন্যতম বড় সংকট। সেটা সাপে কাটা, কিংবা অন্তঃসত্ত্বা নারীর জরুরি অস্ত্রোপচারের সময় বেশি টের পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের। দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক চিকিৎসক নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। এ ছাড়া অ্যান্টিভেনমের মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকা সত্ত্বেও তা রোগীরা পান না বলে অভিযোগ।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মানস বিশ্বাস দাবি করেন, ‘বর্তমানে হাসপাতালে ১০টি অ্যান্টিভেনম মজুদ রয়েছে। এসব অ্যান্টিভেনম স্থানীয় এক দানবীরের সহায়তায় সংগ্রহ করা হয়েছে।’
রোগীকে কেন অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়নি এমন প্রশ্ন তিনি এড়িয়ে যান। সরকারি বরাদ্দের অ্যান্টিভেনমের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি আর কোনো মন্তব্য না করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে তিনি হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি ফোন নাম্বার পাঠান।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে পাঠানো তালিকায় দেখা যায়, ছয় মাসে ৩৬ জনকে সাপে কেটেছে। তার মধ্যে মে মাসে সর্বোচ্চ ১৩ এবং জুন মাসে ১০ জন সাপে কাটা রোগী তারা পেয়েছে। তবে তাদের অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের কোনো তথ্য তালিকায় নেই। জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত অ্যান্টিভেনম মজুদের সংখ্যা অপরিবর্তিত (সবসময় ১০টি) দেখা গেছে।
তবে সরকারিভাবে অ্যান্টিভেনম কেনার জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, সরকার উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম বরাদ্দ দেয় এবং তা সংরক্ষণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।
অ্যান্টিভেনম বাইরে থেকে কেনার বিষয়ে সিভিল সার্জন বললেন, ‘আমি বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করব। কেন বাইরে থেকে কিনতে হবে? কেউ দান করুক না করুক, সরকারিভাবে অ্যান্টিভেনমের জন্য তো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টাকা দেওয়া হয়েছে।’
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সাপে কাটার চিকিৎসার আরেকটি বড় সংকট হিসেবে দেখছেন ওঝার কাছে যাওয়া। এ কারণে চিকিৎসা দিতে দেরি হয়ে যায়। ওঝার কাছে ঘুরে জেলা হাসপাতালে আসতে আসতে সময়ক্ষেপণ হয়। ততক্ষণে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।
চমেক অ্যান্টিভেনম রিসার্চ সেন্টারের মুখ্য গবেষক অনিরুদ্ধ ঘোষ বলেছেন, ‘প্রতি বছর চার লাখের বেশি মানুষকে সাপে কাটে। এর মধ্যে সাড়ে সাত হাজার মারা যায়। ওঝার কাছে না গিয়ে সাপে কাটার রোগীকে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সদর হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা মিলবে।’





