‘মিসরীয় ওরাসকম’ মেড ইন টঙ্গী মডেল

প্রতীকী ছবি
মেড ইন জাপান ভার্সেস মেড ইন জিনজিরা। সূর্যদোয়ের দেশ জাপান প্রকৌশলগত দিক থেকে অগ্রগামী। জাপানি পণ্যের জুড়ি মেলা ভার। বিশেষ করে টিভি, ফ্রিজসহ নানা ইলেকট্রনিক সামগ্রী। রূপে গুণে মানে অনন্য, টেকসই। উচ্চ দাম।
বিপরীতে জিনজিরা নামটি এলেই চোখে ভাসে একটা অনুকরণীয় পণ্য। হুবহু জাপানি বা চায়না পণ্য তৈরিতে ঢাকার কেরানিগঞ্জের জিনজিরার কারিশমা তুলনাহীন। শুধু কি ইলেকট্রনিক সামগ্রী, দেশের বাজারে খ্যাতি অর্জনকারী বিভিন্ন পণ্যের নকল মেলে এখানে। সংক্ষেপে ব্যঙ্গ করে বলা হয় ‘মেড ইন জিনজিরা।’
জিনজিরার তৈরি পণ্য আসল ভেবে ঠকে যান অনেকে। পণ্যের গায়ে তারা ঠিকই জাপান, চায়না বা অন্য কোনো দেশের নাম দেখে কিনেন। ব্যবহার করতে গিয়ে যখন টের পান নকল ততক্ষণে আম ছালা দুটোই যায়। প্রতারণা বা ধোঁকাবাজি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মনোরেল প্রকল্প নিয়ে ‘মেড ইন জিনজিরা’ ধরনের একটি প্রতারণা হয়ে গেল। আগামীর সময়-এর শনিবারের প্রধান প্রতিবেদনে তার বিশদ বর্ণনা। প্রতিবেদনের মূল দিকটিতে একবার চোখ বুলিয়ে আসা যাক।
বিশ্বখ্যাত দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা একটি চক্রের। বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান দুটির একটি মিসরের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস’। অপরটি একই দেশের বৈশ্বিক নির্মাণ জায়ান্ট ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন’।
এই প্রতিষ্ঠান দুটির বাংলাদেশে অনুমোদিত প্রতিনিধি সেজে সিটি করপোরেশন ও বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডার) সঙ্গে দেন-দরবার করেছেন ওই ব্যক্তি। তার নাম কাউছার আলম চৌধুরী। বাড়ি তার নোয়াখালীর সদর থানা সোনাপুরের এক গ্রামে। নোয়াখালীর লোক বলেই কথা। মেধা-বুদ্ধি-শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যে, কর্মে-কৌশলে তাদের জুড়ি মেলা ভার। এদের মধ্যে কেউ কেউ খুবই বুদ্ধিমান। আবার কেউ কেউ ধূরন্ধর। তাছাড়া চট্টগ্রাম-ঢাকায় এদের খুব শক্ত অবস্থান সব সেক্টরে। সে কারণে নোয়াখালীর মানুষ মানে একটু অন্যরকম কিছুটা ব্যতিক্রমও। কাউছার শুধু দেন-দরবারই করেননি, রীতিমতো সমঝোতা স্মারকও সই করে ফেলেছেন। ওরাসকমের মিসরের ঠিকানা ব্যবহার করে চুক্তিও।
নগরে মেট্রোরেল চালুর জন্য প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে এখন সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। সেটি শেষ না হতেই হঠাৎ মনোরেলের প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে সিটি করপোরেশন ও বিডা। কেন? তাও এই কাউছার। তিনিই সরকারি সংস্থার শীর্ষ ও প্রভাবশালীদের কাছে গিয়ে তাদের মন গলাতে সক্ষম হয়েছেন।
আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থা ওই ব্যক্তির পরিচয় বা প্রতিনিধি দাবির বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি। প্রয়োজন মনে করেনি নাকি জেনে চুপ ছিল সেই প্রশ্নও এখন আসছে। চক্রটির ডালপালা সংস্থা দুটিতেও ছড়ায়নি তো!
অথচ ওরাসকম কর্তৃপক্ষ ও আরব কন্ট্রাক্টরস আগামীর সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে স্পষ্ট জানিয়েছে, বাংলাদেশে তাদের কোনো স্থানীয় প্রতিনিধি নেই। কাউছার আলম নামে কোনো ব্যক্তি তাদের সঙ্গে যুক্ত নন।
কাউছার চুক্তির কাগজপত্রে ওরাসকমের মিসরের ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। আগামীর সময়কে তিনি যে ট্রেড লাইসেন্স পাঠিয়েছেন সেটা আবার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টঙ্গী এলাকার। এটা দেখে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশি পণ্যের কথা মনে পড়তে পারে। বৈদ্যুতিক পাখার নাম ‘ন্যাশনাল ফ্যান’, মেড ইন টঙ্গী। বিখ্যাত এই পাখাটির অনেক নকল বাজারে।
ওরাসকম ও আরব কন্ট্রাক্টরসের কথিত বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাউছার আলমের কাজকর্ম ঠিক মেড ইন জিনজিরা বা মেড ইন টঙ্গীর মতো হয়ে গেল। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একটি ট্রেড লাইসেন্সে চলছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের অনুমোদিত প্রতিনিধির কার্যালয়। তাও ট্রেড লাইসেন্সটির মেয়াদ শেষ হয়েছে বছরখানেক আগে।
এই হচ্ছে মিসরের ওরাসকম ও আরব কনস্ট্রাকশনের মেড ইন টঙ্গী মডেল। প্রতিবেদন প্রকাশের পর সিটি করপোরেশন নড়েচড়ে বসে। করপোরেশন যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে তাতে এতদিন ঢাকঢোল পিটিয়ে বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি, সমঝোতা সইয়ের যে গালগপ্প ছিল তা থেকে কৌশলে সরে আসার নিষ্ফল চেষ্টাও লক্ষ করা যাচ্ছে।
এখন তারা বলছে এটার নাম ওরাসকম বাংলাদেশ। এটা মিসরের নয়। মানে ‘ওরাসকম মেড ইন টঙ্গী।’ কিন্তু মিসরের প্রতিষ্ঠান দুটির লোগো ব্যবহার করে যে সমঝোতা স্মারক হয়েছে তা কীভাবে অস্বীকার করবে। এক চুরি ঢাকতে গিয়ে হাজার মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার মতো বোকামি।
সে যাক। গোপাল ভাঁড়ের একটা গল্প আছে। সেটি জানেন তো! একবার গোপাল ভাঁড়কে একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করার ঘোষণা দেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। এতে ঈর্ষান্বিত হয়ে মন্ত্রী মহাশয় এমন একজন বহুরূপী অভিনেতাকে খুঁজে বের করেন, যাকে দেখতে গোপালের মতো।
রাজসভায় হঠাৎ একই রকম দু’জন গোপালকে দেখে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রসহ সবাই বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলেন। নকল গোপাল এত সুন্দর অভিনয় করছিল যে কে আসল আর কে নকল তা শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মন্ত্রী নতুন গোপালকে আসল গোপাল হিসেবে উপস্থাপনে ব্যস্ত।
আসল গোপাল বুঝতে পারলেন সোজাসুজি তর্ক করে নিজেকে প্রমাণ করা যাবে না। তিনি বললেন, ‘মহারাজ, একটি পরীক্ষার মাধ্যমেই আসল-নকল চিহ্নিত হয়ে যাক। রাজসভার সবচেয়ে প্রিয় এবং গোপন কোনো রান্নার স্বাদ পরীক্ষা করতে দিতে হবে দু’জনকে।’
আসল গোপালের রাজসভার গোপন বিষয়াদি নখদর্পনে। পরীক্ষার এক পর্যায়ে, আসল গোপাল এমন কিছু চতুর প্রশ্ন এবং রাজবাড়ির ভেতরের কিছু হাঁড়ির খবর উত্থাপন করেন। নকল গোপাল মন্ত্রীর শেখানো বুলি বলতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। তার পলায়নপর অবস্থা। স্বীকার করে নেয় যে মন্ত্রীর প্ররোচনায় সে নকল গোপাল সেজেছে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ক্ষুব্ধ হয়ে নকল গোপাল ও মন্ত্রীকে কঠোর শাস্তি দেন।
গোপাল ভাঁড়ের সেই পুরনো রম্য-রঙ্গ কাহিনীর পুনরাবৃত্তি হবে এ ‘ওরাসকম মেড ইন টঙ্গী’র ঘটনায়। প্রায়ই হুবহু নকল গোপাল ভাঁড়ের মতো চৌকষ অভিনয় করে যাওয়া কাউছার চৌধুরী কি শাস্তি পাবেন? আর তাকে আসল ওরাসকম ও আরব কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধি হিসেবে সহজে বিশ্বাস করে উন্নয়ন সভায় উপস্থাপনকারী এসব ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তির কোন পর্যায়ে অথবা কোন পদ্ধতিতে শাস্তির মুখোমুখি করা হবে!
নাকি সব ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে?




