স্ত্রী-মেয়ের খুন নিয়ে সুজন বড়ুুয়ার যে সন্দেহ

স্ত্রী-কন্যাকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন সুজন বড়ুয়া
চাচাতো ভাই তেজপ্রিয় বড়ুয়াকে এক লাখ ১৭ হাজার টাকা ধার দিয়েছিলেন সুজন বড়ুয়া। স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে প্রতি মাসে সুদ পরিশোধের অঙ্গীকার করেছিলেন তেজপ্রিয়। তার হাতেই খুন হয়েছেন সুজনের স্ত্রী ও মেয়ে।
সুজনের সন্দেহ, ঋণ পরিশোধ না করার জন্য অঙ্গীকারনামা গায়েব করতেই তেজপ্রিয় তাদের ঘরে ঢুকেছিলেন। বাধা দেওয়ায় তার স্ত্রী ও মেয়েকে খুন করেছেন। তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলেকেও আঘাত করে আহত করেছেন।
সুজনের দেওয়া এ তথ্য নিয়েই চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার তদন্ত এবং সন্দেহভাজন তেজপ্রিয়কে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম।
গতকাল শনিবার রাতে উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের পূর্ব কন্যারা গ্রামের বড়ুয়াপাড়ায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতরা হলেন, সুজন বড়ুয়ার স্ত্রী এনি বড়ুয়া (৪০) ও তার মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)। আহত হয়েছে ছেলে পিয়াস বড়ুয়া।
সুজন বড়ুয়া চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জে একটি আবাসিক ভবনের নিরাপত্তা প্রহরী। ঘটনার সময় তিনি কর্মস্থলে ছিলেন। জানালেন, ‘রাত ১১টায় আমার এক বৌদি ফোন করেন। বললেন ‘তোমার বৌ, মেয়েকে মেরে ফেলেছে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই রওনা দিই। রাত ১২টার দিকে বাড়ি পৌঁছাই। দেখি আমার স্ত্রীর লাশ ঘরের সামনে উঠোনে পড়ে আছে। মেয়ের লাশ রান্নাঘরে পড়ে আছে।’
প্রতিবেশী সুরভী বড়ুয়ার দাবি, মৃত্যুর আগে এনি তার চাচাতো দেবর তেজপ্রিয় বড়ুয়ার নাম উল্লেখ করেন। ঘটনার পর থেকে তেজপ্রিয়র আর খোঁজ মিলছে না।
তেজপ্রিয়র সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না বলে জানালেন সুজন। ‘আমি শুক্রবার বাড়িতে ছিলাম। বাড়িতে একটা টিউবওয়েল বসানো হচ্ছে। সারাদিন তেজপ্রিয়সহ আমরা কয়েকজন সেই কাজ দেখভাল করি। সন্ধ্যায় ঘরের উঠোনে বসে একসঙ্গে চা-নাস্তা খাই। শনিবার সকালে শহরে চলে আসি। রাতে আমার স্ত্রী আর মেয়েকে মেরে ফেলার খবর পাই।’
সুজনের ভাষ্য, তেজপ্রিয় বিদেশে ছিলেন। দুই বছর আগে দেশে ফিরে আর যাননি। তার মায়ের অনুরোধে প্রথম দফায় সিএনজি অটোরিকশা কেনার জন্য ৫০ হাজার টাকা ধার দেন তেজপ্রিয়কে। এরপর আরও দুই দফায় ৫৭ হাজার টাকা ধার দেন। তেজপ্রিয়র স্বাক্ষর করা তিনটি স্ট্যাম্প তার ঘরের আলমারিতে রাখা ছিল।
‘চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে তেজপ্রিয় সুদ পরিশোধ করে আসছিল। এটা নিয়ে তার সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ হয়নি। এখন বুঝতে পারছি সে বোধহয় ধার শোধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এজন্য সে স্ট্যাম্পগুলো আমার ঘর থেকে নিয়ে যেতে এসেছিল। বাধা দেওয়ায় আমার স্ত্রী আর মেয়েকে খুন করেছে।’
‘আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমি তার ফাঁসি চাই’,— যোগ করেন সুজন বড়ুয়া।
এনি ও প্রিয়ন্তীকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে খুন করা হয়েছে বলে জানালেন চট্টগ্রামের আনোয়ারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান। ‘চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় এনি ঘর থেকে বের হয়ে পিয়াসকে কোল থেকে উঠোনে ছুড়ে ফেলে লুটিয়ে পড়েন। লোকজন তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তিনি সেখানেই মারা যান। লোকজন ঘরের ভেতরে ঢুকে প্রিয়ন্তীর রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান।’
এদিকে চট্টগ্রামের এসপি মাসুদ আলম আজ রবিবার দুপুরে আনোয়ারায় সুজন বড়ুয়ার বাড়িতে যান। তিনি হত্যাকারীকে দ্রুত গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেন।
ঘটনাস্থল ঘুরে এসপি মাসুদ আলম সাংবাদিকদের জানালেন, ‘সন্দেহভাজন হত্যাকারী ভিকটিমদের একেবারে কাছের। সে জানত ঘরে কারা আছে। সে পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকেছিল বলে আমাদের ধারণা। এরপর প্রথমে মেয়েটিকে খুন করে। চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে মাকেও ছুরিকাঘাত করে। ট্রিপল নাইনে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। ঋণের একটা বিষয় আমরা জানতে পেরেছি। তাকে গ্রেপ্তার করার পর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিভ এবং এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি-না জানা যাবে।’
আজ বিকালে নিহতদের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের সদস্যদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে শোকার্ত স্বজনরা দিনভর অপেক্ষায় ছিলেন। এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি।



