চোখের চিকিৎসাসেবার পথিকৃৎ ডা. রবিউল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে রাজ্যের সংকট। অর্থ ও অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি স্বাস্থ্য চিকিৎসা সংকট ছিল প্রকট। ওই সময়ে যুবক রবিউল হোসেন স্বাস্থ্য সংকটের বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বিশেষ করে দেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি বা অন্ধত্বের সমস্যাকে চিহ্নিত করে সমাধানে নিজেকে সপে দিলেন অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন।
১৯৭৩ সাল। চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লার একটি পরিত্যক্ত ভবনে তিনি ৪০ শয্যার চোখের হাসপাতাল শুরু করলেন। পথচলার সেই শুরু। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে সরকারের পাশাপাশি রবিউল হোসেন নিজে অনেক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও দানশীল ব্যক্তির দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তার সুফলও পেয়েছিলেন।
মাত্র ৩ হাজার ৬০০ টাকা হাতে নিয়ে হাসপাতালের যাত্রা তার। ২০২১ সালে পাহাড়তলীতে নিজের গড়া চট্টগ্রাম আই ইনফর্মারি অ্যান্ড ট্রেনিং কমপ্লেক্সে গিয়েছিলাম তার সাক্ষাৎকার নিতে। আলাপচারিতায় এসব কথা ওঠে আসে। সেই থেকে ৫২ বছর ধরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশের চোখের চিকিৎসায় অসামান্য অবদান রেখে গেলেন রবিউল হোসেন। আজ শনিবার তিনি তার হাতে গড়া আরেকটি প্রতিষ্ঠান ইমপেরিয়াল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
পাহাড়তলিতে বাংলাদেশ আই ইনফার্মারি অ্যান্ড ট্রেনিং কমপ্লেক্সটির (বিএনএসবি) উদ্বোধন হয় ১৯৮৩ সালে। এর আগে ১৯৭৮ সালে রবিউল হোসেন সরকারের কাছে জায়গার আবেদন করেছিলেন। আস্তে আস্তে কলেবর বাড়তে থাকে হাসপাতালের। চোখের চিকিৎসায় এই বেসরকারি হাসপাতাল এ অঞ্চলের মানুষের কাছে আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।
ওই সময়ে একদল তরুণ চিকিৎসক ও কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে কাজটি শুরু করেন অধ্যাপক রবিউল হোসেন। তাদের একজন বর্তমানে শেভরন আই হাসপাতালের ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জানালেন, ‘রবিউল হোসেন স্যার আজীবন মানুষের চোখের চিকিৎসার কথা ভেবে গেছেন। বর্তমানে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় বড় চক্ষু চিকিৎসকদের অনেকেই তার সংস্পর্শ পেয়েছেন। ট্রেনিং নিয়েছেন বিএনএসবিতে।’
শুধু চোখের হাসপাতাল গড়েই বসে থাকেননি রবিউল হোসেন। চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটিও সুনিপুনভাবে করে গেছেন সারাজীবন। প্রত্যন্ত অনগ্রসর এলাকায় শুরু করেন চক্ষুশিবির। প্রথম চক্ষুশিবিরের আয়োজন হয়েছিল ১৯৭৪ সালে, কক্সবাজারে। এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩০০টি চক্ষু শিবির পরিচালনা করেছে তার প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া প্রায় ৫৫ লাখ মানুষের চোখের চিকিৎসায় অবদান রেখেছে বিএনএসবি।
শেভরণ চক্ষু হাসপাতালের ডা. এম এ করিম অধ্যাপক রবিউল হোসেনের সঙ্গে ২৩ বছর কাজ করেছেন বিএনএসবিতে। ড. করিম বললেন, ‘রবিউল হোসেন স্যার যখন চোখের হাসপাতাল চালু করেন তখন সরকারিভাবে চোখের চিকিৎসা সেভাবে হতো না। তিনি চক্ষু চিকিৎসার আধুনিকায়নে কাজ করে গেছেন। সেবার কারণে তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিএনএসবি মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।’
ডা. রবিউলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের সম্পাদক রুশো মাহমুদের। তিনি জানালেন, ‘ডা. রবিউল হোসেন শুধু একজন চোখের ডাক্তার ছিলেন না, ছিলেন কাজ পাগল মানুষ আর বড় মাপের সংগঠক। বাংলাদেশের চক্ষু চিকিৎসায় যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে গেছেন তিনি। সরকারের দেওয়া রেলের জায়গায় প্রায় একক প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশর প্রথম চক্ষু হাসপাতাল। যেখানে গরিব মানুষ চিকিৎসা সেবা পায় সবার আগে। স্থাপত্য সুন্দর এই হাসপাতাল তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জার্মানির স্কুলের বাচ্চাদের টিফিন থেকে বাঁচানো অর্থের অনুদানে। জার্মান নাগরিক রোজি গোল্ডম্যান তার সংস্থা আন্দেরি হিলফে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডা. রবিউল হোসেনকে এই কাজে সহযোগিতা করেন। অসাধারণ এই কাজের জন্যই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি।’





