মোশাররফের প্রয়াণ: আওয়ামী রাজনীতির ‘ট্রায়ো’ যুগের অবসান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে জনতাকে সংগঠিত করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শুভপুর ব্রিজ প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এতে পাকিস্তানি সেনাদের এই মহাসড়ক যোগাযোগ অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্রের নবম খণ্ডে এ ঘটনার উল্লেখ আছে। মুক্তিযুদ্ধে মোশাররফ মেজর জিয়াউর রহমানের অধীন এক নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন।
আজ বুধবার সকালে একাত্তরের রণাঙ্গনের বীরসেনানি ৮৩ বছর বয়সী বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জীবনাবসান হয়েছে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জিতে প্রথমবার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হয়েছিলেন ২৭ বছর বয়সী মোশাররফ হোসেন। স্বাধীন দেশে তিনি আরও ৬ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দুই দফায় মন্ত্রী ছিলেন। আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী- এ তিনজনকে বলা হতো স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামে আওয়ামী রাজনীতির তিন কর্ণধার বা ‘ট্রায়ো’। তিনজনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে তিন নেতা চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। বাবু-মহিউদ্দিন গত হয়েছেন আগেই। মোশাররফের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্য রাজনীতির একটি অধ্যায়ের অবসান হলো।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মোশাররফের গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানের কথা তুলে ধরলেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান, ‘ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং মুক্তিযুদ্ধ, সবখানেই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ভূমিকা ছিল। শুভপুর ব্রিজ ধ্বংস করা তার দুঃসাহসিক অভিযান ছিল। কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান প্রথমে শুধু নিজের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। মোশাররফ ভাইসহ কয়েকজন নেতা গিয়ে বোঝানোর পর তিনি আবার বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা দেন। এটাও উনার একটা ঐতিহাসিক ভূমিকা। বাহাত্তরে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন।’
১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া মোশাররফ ষাটের দশকে পাকিস্তানের লাহোর থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেন। প্রথাগত ছাত্র রাজনীতি না করেও সত্তরের নির্বাচনে তিনি কিভাবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেন, জানালেন মাহফুজুর রহমান, ‘মোশাররফ ভাইয়ের বাবা মুসলিম লীগ নেতা ছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা এম এ আজিজ কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতার ছেলেকে দলে এনে প্রার্থী করেন। যাতে মুসলিম লীগের নেতারা বিরোধিতা করতে না পারেন। এম এ আজিজের হাত ধরেই মোশাররফ ভাই আওয়ামী লীগে যোগ দেন।’
ডাকসাইটে নেতা হলেও মোশাররফ ছিলেন শান্ত, ধীর মেজাজের কিন্তু আবেগপ্রবণ। শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, স্মার্ট নেতা হিসেবে সমাদৃত ছিলেন সর্বমহলে। মন্ত্রী থাকার সময় চট্টগ্রামে এলে পারতপক্ষে পুলিশ প্রটোকল এড়িয়ে চলতেন।
২০১৮ সালে শেষবার চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসন থেকে তিনি নির্বাচন করেন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আর অংশ নেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর ২৭ অক্টোবর তাকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান।
৮২ বছর বয়সী মোশাররফ হোসেন কারাবাসের ধকল সামলাতে পারেননি বলে অভিযোগ করলেন মীরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির, ‘৫ আগস্টের পর তার বিরুদ্ধে ১২টা মামলা দেওয়া হয়। একবছর ধরে জেলে ছিলেন। ঠিকমতো চিকিৎসা হয়নি। ওষুধ খেতে পারেননি। ফুসফুসে সংক্রমণ। জেল থেকে অনেকটা মৃত্যুশয্যায় বের হয়েছেন। ৮২ বছর বয়সেও আদালতে গিয়ে হাজিরা দিয়েছেন। ইউনূসের সরকার একজন কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধাকে ১২টা মামলা দিয়ে জেলে নিয়ে যেভাবে নির্যাতন করেছে, এটা চরম প্রতিহিংসা। অথচ ড. ইউনূস চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে মোশাররফ ভাইয়ের সিনিয়র ছিলেন। উনাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল।’
গত মার্চে মোশাররফের ছোট ভাই মোয়াজ্জেম হোসেন মারা যান। শোকগ্রস্ত মোশাররফ এরপর আর শয্যা ছেড়ে উঠতে পারেননি বলে জানালেন ঘনিষ্ঠরা।
আওয়ামী লীগ নেতা বেদারুল আলম চৌধুরী বেদার জানালেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম নগরীর জামিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ ময়দানে প্রয়াতের প্রথম জানাজা হবে। বাদ জোহর মীরসরাইয়ের ধুম ইউনিয়নের ফজলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ ময়দানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।




