‘চুরির উৎসব’ চট্টগ্রাম নগরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘দুপুরে পাশের বিল্ডিংয়ে চেঁচামেচি। বিল্ডিংয়ের দোতলার বাসার জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দুটি মোবাইল নিয়ে চোর পাশের নালা দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। লোকজন জড়ো হয়ে নালার কাছে যাওয়ার আগেই চোর হাওয়া। সন্ধ্যার পর আমাদের বিল্ডিংয়ের নিচতলায় দেখি পানির মোটর নেই। চোরের জ্বালায় অতিষ্ঠ। আতঙ্কে রাতে ঘুমাতেও পারি না।’
কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম নগরীর আসকারদিঘীর পাড় রামকৃষ্ণ মিশন লেইনের পাঁচতলা ভবনের মালিক সিতারা শামীম। জানালেন, গত এক সপ্তাহে তাদের এলাকায় ফুটবলার মাহবুবের বাসাসহ তিনটি ভবনের তিন বাসায় চুরি হয়েছে। বৈদ্যুতিক তার, পানির ট্যাপ-মোটর, স্বর্ণালংকার, মোবাইল নিয়ে গেছে চোরের দল। দুপুর থেকে রাতের মধ্যে একই বাসায় তিনবার চুরির চেষ্টা হয়েছে।
গত দুই মাস ধরে এভাবে চট্টগ্রাম নগর জুড়ে অনেকটা ‘উৎসবের আমেজে’ চলছে চুরিচামারি। এসব চুরির ঘটনার অধিকাংশই কিন্তু পুলিশের রেকর্ডে নেই। কারণ ভুক্তভোগীরা পুলিশকে জানাতে আগ্রহী নন। যেমন সিতারা শামীমের ভাষ্য, পুলিশকে জানিয়েও কোনো লাভ হয় না। তারা আসে। তদন্ত করে। এরপর আর খবর থাকে না।
প্রতিকার না পেয়ে নগরবাসীর মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ২১ জুন নগরীর পলোগ্রাউন্ডে রেলওয়ে পাবলিক হাইস্কুলে চোর সন্দেহে পিটুনিতে জয়নাল নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। ২৪ জুন মোবাইল চুরির সময় হাতেনাতে এক যুবককে ধরে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে দেয় আসকারদিঘীর পাড়ের লোকজন।
চোরের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না মসজিদ-মন্দিরও। গত ১৯ জুন দুপুরে নগরীর সদরঘাটে একটি জামে মসজিদের অফিস কক্ষ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা চুরি হয়। পুলিশ অবশ্য একদিনের মধ্যে ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর গোসাইলডাঙায় কালীমন্দির থেকে টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরি হয়। গত সপ্তাহে আসকার দিঘীর পাড়ের রামকৃঞ্চ মিশন মন্দিরেও চুরি হয়েছে বৈদ্যুতিক তার।
এর আগে, গত ১৭ মে ভোরে নগরীর রাজাপুর লেইনে মিলন ধরের বিল্ডিংয়ের চারতলায় রাজু চৌধুরীর বাসা থেকে দুটি মোবাইল চুরি হয়। তিনি কোতোয়ালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেও কোনো প্রতিকার পাননি। পরে তিনি নিজেই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে অপরাধীর ছবি শনাক্ত করেন। লোকজন নিয়ে বাকলিয়ার পোড়া কলোনিতে গিয়ে চোর ধরে মোবাইল দুটি উদ্ধার করেন। এরপর জিডি প্রত্যাহার করে নেন বলে তিনি জানালেন।
মোমিন রোডের বিপ্লবী বিনোদ বিহারী গলিতে সিএমপির দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনারের কার্যালয় গেটের মুখোমুখি চৌধুরী ভিলার দোতলায় গত ২৭ মে চুরির ঘটনা ঘটে। বাসায় লোকজনের অনুপস্থিতির সুযোগে লোহার গ্রিল ও কাচের জানালা খুলে চোর ঢুকে বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায়। ২২ জুন নগরীর রহমতগঞ্জে নুপুর কন্ট্রাক্টর ভবনের চারতলায় গৌতম চৌধুরীর বাসা থেকে ২টি মোবাইল ও ১টি ল্যাপটপ জানালা দিয়ে বের করা হয়। তবে ল্যাপটপটি বাসার কার্নিশে ফেলে যায়। এসব চুরির ঘটনার একটিও পুলিশকে অবহিত করা হয়নি।
রেকর্ডে তেমন একটা না থাকলেও চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ আছে নগর পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে। তবে অভিযোগ না পাওয়ায় এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে জানালেন সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ। বললেন, ‘কেউ যদি থানায় না আসে, আমাদের পক্ষে তো তাকে প্রতিকার দেওয়া সম্ভব নয়। ছিনতাইকারী, চোর, মাদকসেবী, মাদকবিক্রেতা নিয়মিত প্রচুর ধরা পড়ছে। জেলে যাচ্ছে। আবার জামিনে বেরিয়ে আসছে।’
নগরীর ৪-৫টি থানা এলাকায় চুরি-ডাকাতি বেশি হচ্ছে বলে জানালেন সিএমপির আরেক কর্মকর্তা। বললেন, কোতোয়ালী, বাকলিয়া, সদরঘাট, চকবাজার, খুলশী, ডবলমুরিং, ইপিজেড এলাকা থেকে চুরির খবর বেশি আসছে। বস্তি, পাহাড়, রেলস্টেশন যেখানে আছে, সেখানে এ ধরনের অপরাধ বেশি হয়।
সিএমপির রেকর্ডে থাকা তথ্য, গত পাঁচ মাসে নগরীতে ২১১টি চুরি, সিঁধেল চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ৫৩টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩১টি, মার্চে ৪০টি, এপ্রিলে ৫২টি এবং মে মাসে ৩৫টি মামলা হয়েছে বিভিন্ন থানায়। গত বছরের একই সময়ে অর্থাৎ পাঁচ মাসে ২১৫টি মামলা হয়েছিল।
গোয়েন্দা ইউনিটের কয়েকজন কর্মকর্তা জানালেন, চুরির সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই মাদকসেবী ও ভাসমান লোকজন। আগে সিএমপির কাছে এমন অপরাধীদের এলাকাভিত্তিক তালিকা ছিল। চুরি-ছিনতাই বাড়লে রেলস্টেশন, বস্তি, ফুটপাতসহ অপরাধপ্রবণ স্পটগুলোয় পুলিশ বিশেষ অভিযান চালাত। নিয়মিত অভিযান তো ছিলই।
কিন্তু গত দুই বছরে ছিঁচকে চুরি, সিঁধেল চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের সার্বক্ষণিক কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। অপরাধীদের হালনাগাদ কোনো তালিকাও নেই সিএমপির কাছে। বহুমাত্রিক অপরাধপ্রবণ চট্টগ্রাম নগরীতে অপরাধ মোকাবিলায় সক্ষম, দক্ষ, চৌকস কর্মকর্তাদের সাংগঠনিক কাঠামোও সিএমপিতে এ মুহূর্তে নেই।
গৎবাঁধা রুটিন ওয়ার্ক দিয়ে নগরবাসীকে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা দেওয়া যাচ্ছে না। সিএমপির অনেক কর্মকর্তাই আলাপে বিষয়টি স্বীকার করলেও নাম প্রকাশে রাজি হননি।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বললেন, ‘এলাকাভিত্তিক অপরাধীদের তালিকা আমরা হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছি। হালনাগাদের পর পুরো শহর জুড়ে বিশেষ অভিযান জোরদার করা হবে।’




