৮ কোটি টাকা ব্যবসার অপারেটর নিয়োগ ৮০ সেকেন্ডে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জেটিসহ সাগরে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানামার বিশেষায়িত কাজ পেতে অপারেটর নিয়োগ দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ৪৫০ আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের সাক্ষাৎকার বা মৌখিক পরীক্ষা নিতে সময় রাখা হয়েছে দুদিনে ১০ ঘণ্টা। এর মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার ২২৫ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য সময় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা। মাঝখানে এক ঘণ্টা বিরতি। সে হিসাবে সময় বরাদ্দ ৫ ঘণ্টা। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ৪৫ জন প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেবে বন্দর। সেক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের গড় সময় বরাদ্দ থাকবে মাত্র ১ মিনিট ২০ সেকেন্ড বা ৮০ সেকেন্ড! যাকে ‘নজিরবিহীন দ্রুতগতির’ সাক্ষাৎকার হিসেবে দেখছেন বন্দর-সংশ্লিষ্টরা।
পণ্য ওঠানামার সংবেদনশীল বিশেষায়িত কাজের জন্য যাচাই করতে হবে ওই প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার ভারী যন্ত্রপাতির বিস্তারিত, তাদের কারিগরি সক্ষমতা, আর্থিক স্থিতি, আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে কি না— এসব নানা কিছু। মাত্র ৮০ সেকেন্ডে কীভাবে এসব যাচাইয়ের মাধ্যমে যোগ্য অপারেটর বাছাই করা হবে— তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিস্ময়। অভিযোগ উঠেছে, এসব শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা ‘আইওয়াশ’; তালিকা আগেই চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, একজন আবেদনকারী কক্ষে প্রবেশ করে পরিচয় দেওয়া ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র টেবিলে রাখতেই এক থেকে দুই মিনিট সময় চলে যায়। সেখানে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের ভারী ইকুইপমেন্ট (যেমন : মোবাইল ক্রেন, ফর্ক লিফট ও গ্যান্ট্রি ক্রেন), ডক শ্রমিকের ব্যবস্থাপনা এবং কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ট্র্যাক রেকর্ড মূল্যায়নে ৮০ সেকেন্ড বরাদ্দ দেওয়া হলে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াই পড়ে যাবে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।
বন্দরের বহির্নোঙরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর বছরে ২ কোটি টাকা, জেটিতে বার্থ অপারেটর বছরে ৮ কোটি টাকার কাজ করে জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সরওয়ার হোসেন। তার ভাষ্য, ‘শেষ মুহূর্তে বন্দর চেয়ারম্যানসহ বোর্ড তড়িঘড়ি করে কেন এই উদ্যোগ নিচ্ছে বোধগম্য নয়। দ্রুতগতির এই প্রক্রিয়ায় কী মধু আছে আমরা (বর্তমান অপারেটররা) বুঝছি না। এটি বিশেষায়িত কাজ এখানে যোগ্যতার মূল্যায়ন না হলে সেক্টরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।’
অপারেটর নিয়োগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিবের সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা আছে, ‘বার্থ, টার্মিনাল ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর লাইসেন্স দেওয়ার জন্য আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার ২০ এবং ২৭ আগস্ট বন্দর ভবনের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত হবে।
জানা গেল, প্রতিটি আবেদনপত্রের সঙ্গে অফেরতযোগ্য (নন-রিফান্ডেবল) ফি হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়েছে ১ লাখ টাকা। সে হিসাবে ৪৫০টি আবেদন থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের কোষাগারে এককালীন জমা পড়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়লেও বন্দর কর্তৃপক্ষ হয়তো শেষ পর্যন্ত এত প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করবে না।
কম সময়ে এত বেশি লোকের সাক্ষাৎকার অস্বাভাবিক কি না— এমন প্রশ্নের উত্তরে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বললেন, ‘স্যাররা যেভাবে সময়সূচি ঠিক করেছেন, সেভাবেই হচ্ছে। আমরা আবেদনকারী সবাইকে মেসেজ, কল করে জানিয়েছি। ইন্টারভিউতে বেশিক্ষণ সময় লাগার কথা নয়।’
তিনি এটিও নিশ্চিত করেন, তালিকাভুক্ত হওয়া মানেই বন্দরের কাজ পাওয়া নয়। তালিকাভুক্তরা বন্দরে অপারেটর নিয়োগের দরপত্রে অংশ নিতে পারবেন— এটাই সুবিধা।
‘আলু-পটোল’ ব্যবসায়ীরা বন্দর অপারেটর হয়ে উঠবেন, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই জানিয়ে বন্দরের বার্থ অপারেটর ও সরকারদলীয় এমপি শাহাদাত হোসেন সেলিম বললেন, ‘রাতারাতি পণ্য ওঠানামা এত বাড়েনি যে এতগুলো লাইসেন্স দেওয়া যাবে। আর লাইসেন্স দিলেই যে কাজ পেয়ে যাবে, এমনও না। এখানে অভিজ্ঞতা দক্ষতার ভিত্তিতেই অপারেটর নিয়োগ হয়। বন্দরও সে পথেই হাঁটবে আশা করি।’
২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের পর থেকে ১৮ বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য ওঠানামার কাজ মাত্র ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ কার্গো বার্থের (জিসিবি) ১২টি জেটিতে ১২টি প্রতিষ্ঠান, টার্মিনালে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান এবং বহির্নোঙরে সাগরে লাইটারিং কাজে ৩৩টি শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর কাজ করছে।






