বিপ্লবের পথ ধরে জব্বারের বলীখেলায় যে প্রাণের উচ্ছ্বাস

ফাইল ছবি
চট্টগ্রামে জব্বারের বলীখেলাটি ঐতিহ্যবাহী এবং ঐতিহাসিক। এই বলীখেলার সঙ্গে আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের যোগসূত্র। মূলত আন্দোলনে তরুণ যুবকদের উদ্ধুদ্ধ করতেই এই বলীখেলার প্রচলন করেছিলেন বদরপাতি এলাকার সওদাগর আবদুল জব্বার। শক্তিমত্তা প্রদর্শনের এই মল্লযুদ্ধ বা বলীখেলাটি একাধারে বিনোদন এবং ঐতিহ্যেরও অংশ।
বলীখেলা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নাম। হয় পুরো গ্রামীণ নিয়মকানুনে। এখানে খুঁজে পাওয়া যায় না আন্তর্জাতিক কুস্তি প্রতিযোগিতার নিয়মকানুন। নির্মল বিনোদনই কেবল নয়, শোষণকারীদের বিপক্ষে শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য নিজেকে কিংবা সমাজকে প্রস্তুত করার একটা উদ্দেশ্যও এই মল্লযুদ্ধ। বিভিন্ন বইয়েও এ ধরনের বলীখেলা বা মল্লযুদ্ধের সঙ্গে বিপ্লবী আন্দোলনের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ রয়েছে।
যেমন বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’ বইয়ে লেখক উল্লেখ করেছেন, ‘১৮৯৯-১৯০১ সালের কলকাতায় তরুণ ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্রের উদ্যোগে বাংলার প্রথম গোপন বিপ্লবী দল ‘অনুশীলন সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সমিতির সভাপতি হন প্রমথনাথ নিজে এবং সহসভাপতি চিত্তরঞ্জন দাস (দেশবন্ধু) এবং কোষাধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই সমিতির লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের দ্বারা ইংরেজদের পরাধীনতার নাগপাশ ভারতকে স্বাধীন করা। অনুশীলন সমিতির সদস্যদের লাঠিখেলা, অসি খেলা, ছোরা খেলা, কুস্তি, মুষ্টিযুদ্ধ ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়া হতো। পাশাপাশি চরিত্র গঠনের শিক্ষাও দেওয়া হতো।’
শক্তিমত্তা প্রদর্শনের রেওয়াজ
তখনকার দিনে প্রতিষ্ঠিত জমিদার বা সমাজের বিত্তবানদের মধ্যে ছিল মল্ল কিংবা কুস্তিগীরদের নিজেদের পক্ষে রাখার একটা রেওয়াজ। মূল উদ্দেশ্য সমাজে কিংবা কোনো সংকটকালীন সময়ে নিজের শক্তিমত্তা প্রদর্শন। অনেকটা বর্তমান যুগের পেশিশক্তির রাজনীতি চর্চার মতো ব্যাপার।
দৈনিক আজাদীর ৩৫ বছর পূর্তিতে ‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম’ নামে একটি সংকলন প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই সংকলনে বলা হয়, ‘মল্ল ক্রীড়া চট্টগ্রামে বলীখেলা নামে অভিহিত। এটি চট্টগ্রাম জেলার একটি সুপরিচিত ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ক্রীড়ানুষ্ঠান যা মুসলমান শাসনামল থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। অভিজাত ও বিত্তবান মুসলমানরা সেকালে নামি-দামি কুস্তিগিরদের বেতন দিয়ে প্রতিপালন করতেন যেন তারা বিপদ-আপদে শত্রুর মোকাবিলা করতে পারে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উৎসব উপলক্ষে এরা জনসমক্ষে মহড়া প্রদর্শন করত। কখনো কখনো বিভিন্ন ভূস্বামীর মল্লবিদদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক লড়াই হত জনসমক্ষে। দৈহিক শক্তিধর কুস্তিগিররা তখন নন্দিত হতেন।’
সাধারণত বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠ মাসে খালি জমিতে আয়োজন করা হত বলীখেলা। মাটি খুঁড়ে বানানো হত খেলার মঞ্চ। তাতে দুজন পালোয়ান মুখোমুখি হন যুদ্ধে। ঢোলের তালে তালে তারা অংশ নেন খেলায়। অনেক জায়গায় বলীখেলার পাশাপাশি গরুর (ষাঁড়) লড়াইও হত। কালক্রমে বলীখেলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে লালদীঘি মাঠের শতবর্ষী আবদুল জব্বারের বলীখেলা। এ ছাড়া পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাঙামাটি স্টেডিয়ামে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় একটি বলীখেলা।
মল্লযুদ্ধ যখন বলীখেলা
আবদুল হক চৌধুরীর ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়, ‘প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলের প্রতি জেলায় হাতে গোনা কুস্তি প্রতিযোগিতা বা মল্লযুদ্ধ আয়োজন হত। চট্টগ্রামের মতো দুই মাস ধরে বলীখেলা আর কোথাও হত না। মল্লরা সাধারণত খুব সুঠামদেহী এবং শক্তিশালী হতেন।’
মল্লযুদ্ধ কখন বলীখেলা নামে পরিবর্তিত হয়েছে, তা জানা নেই আবদুল হক চৌধুরীর। আগে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় মল্ল পরিবার ছিল বলে বইটিতে উল্লেখ করেন লেখক।
তাতে বলা হয়, ‘মল্লযুদ্ধে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য সুপ্রাচীনকালের। চট্টগ্রামে মল্ল নামে খ্যাত বহু সুপ্রাচীন হিন্দু-মুসলমান পরিবার দেখা যায়। চট্টগ্রামের ২২টি মল্ল পরিবার ইতিহাস বিখ্যাত। তারা সবাই মধ্য চট্টগ্রাম, অর্থাৎ কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদের মধ্যবর্তী এলাকার ২০ গ্রামের লোক ছিলেন। আশিয়া গ্রামের আমান শাহ মল্ল, চাতরি গ্রামের চিকন মল্ল, কাতারিয়া গ্রামের চান্দ মল্ল, জিরি গ্রামের ঈদ মল্ল ও নওয়াব মল্ল, পারি গ্রামের হরি মল্ল, পেরলা গ্রামের নানু মল্ল, পটিয়ার হিলাল মল্ল ও গোরাহিত মল্ল, হাইদগাঁওর অলি মল্ল ও মোজাহিদ মল্ল, শোভনদণ্ডীর তোরপাচ মল্ল, কাঞ্চননগরের আদম মল্ল, ঈশ্বরখাইনের গনি মল্ল, সৈয়দপুরের কাসিম মল্ল, পোপাদিয়ার যুগী মল্ল, খিতাপচরের খিতাপ মল্ল, ইমামচরের ইমাম মল্ল, নাইখাইনের বোতাত মল্ল, মাহাতার এয়াছিন মল্ল, হুলাইনের হিম মল্ল, গৈরলার চুয়ান মল্ল।’
চট্টগ্রামের বলীখেলা প্রতিযোগিতার বেশির ভাগই ছিল মানুষের নামে। যে ব্যক্তি আয়োজক থাকতেন মূলত তার নামেই। তবে এর বাইরেও হাটহাজারীর বলীখেলা, ফতেপুরের বলীখেলা, পটিয়ার বলীখেলা, মক্কার বলীখেলা ইত্যাদি জনপ্রিয় ছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকার সময় সাহিত্যিক আবুল ফজল ক্যাম্পাসে বলীখেলার প্রবর্তন করেছিলেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররাও অংশ নিতেন। তবে তা কয়েক বছর পর তা বন্ধ হয়ে যায়। আবদুল হক চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আস্তে আস্তে বলীখেলা কমতে থাকে।
এখনও সগৌরবে প্রতিবছর ১২ বৈশাখ লালদীঘি মাঠে হয়ে আসছে শতবর্ষী জব্বারের বলীখেলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও কোভিড-১৯ এর কারণে দুই বছর হয়নি বলীখেলা। আবদুল জব্বার সওদাগরের নামে প্রবর্তিত এই বলীখেলা এবার ১১৭ বছরে পা দিয়েছে। আজ শুক্রবার থেকে শুরু হবে মেলা। আগামীকাল শনিবার বলীখেলা হবে ছয়দফার ময়দান লালদীঘি মাঠে। ১৯০৯ সালে শোষকের বিরুদ্ধে চোখ রাঙানির ভাবনা থেকে শুরু হওয়া জব্বারের বলীখেলা কালক্রমে পরিণত হয়েছে এ অঞ্চলের প্রাণের খেলা ও মেলায়।
জব্বারের বলীখেলার একটা বর্ণনা পাওয়া যায় ব্রিটিশ ভারতবর্ষের মাসিক সাহিত্য সাময়িকী প্রবাসীর আষাঢ় মাসের সংখ্যায়। ১৩২২ বঙ্গাব্দের (১৯১৫ সাল) অনুষ্ঠিত বলীখেলা ঘিরে মেলা ও শহরের মানুষের উন্মাদনা-আগ্রহ নিয়ে লেখাটি লিখেছিলেন মোহিনীমোহন দাস। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হওয়া কমল চৌধুরী সম্পাদিত ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে লেখাটি সংকলিত করা হয়।
তাতে বলা হয় ‘দেখিতে দেখিতে স্থানটি লোকারণ্যে পরিণত হয়। বেলা দশটার পর মল্লগণ (বলী) আসরে অবতীর্ণ হইতে থাকে। ... ভিড় এত বাড়িতে থাকে যেন তখন রাস্তা দিয়ে গাড়ি ঘোড়া চলাচলও প্রায় বন্ধ হইয়া যায়। খেলা আরম্ভ হইলে মল্লগণ রঙ্গস্থলে অবতীর্ণ হইয়া বাদ্যের তালে তালে নৃত্য করিতে থাকে। মল্লগণের মধ্যে একজন অন্যজনকে ‘চিৎপটকন’ দিতে পারিলেই তাহার জিত হইল।’




