পাতালপুরীর লবণরাজ্যে গির্জাসহ আরও যা আছে

মাটির প্রায় সাড়ে তিনশ ফুট নিচে নামার আগে কেউ বুঝতেই পারেনি সামনে কী অপেক্ষা করছে। এই গভীরতায় নামার জন্য তৈরি করা হয়েছে মোট ৩৮০টি ধাপ। সেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় চারপাশের পরিবেশ ক্রমে বদলে যেতে থাকে। নিচের দেয়ালগুলো দেখতে অনেকটা ধূসর। গাইড হঠাৎ বললেন, “দেয়ালটা চেটে দেখুন।” মুহূর্তেই সবাই থমকে যায়। কেউ হাসে, কেউ ইতস্তত করে। তারপর সাহস করে একজন জিভ ছোঁয়াতেই বোঝা গেল, দেয়াল আসলে নোনতা। দেখতে সাধারণ পাথরের মতো মনে হলেও দেওয়ালগুলো আসলে লবণের। তবে একটি নির্দিষ্ট স্থান দেখিয়ে গাইড সাবধান করেন সেখানে যেন কেউ জিহ্বা না ঠেকায়, কারণ এর আগে অসংখ্য মানুষ ঠিক ওই জায়গাতেই তাদের জিহ্বা ঠেকিয়েছেন।
পোল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ক্রাকোর দক্ষিণ পূর্বে মাটির নিচে অবস্থিত এই বিস্ময়কর জায়গাটির নাম ভিয়েলিৎস্কা সল্ট মাইন। এটি একাধারে গির্জা, শিল্পকলা এবং থিম পার্কের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। প্রায় ৭০০ বছর ধরে সচল থাকা খনিটি ১৯৯৬ সালে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। তবে শত শত বছর ধরে খনন করার ফলে মাটির নিচে তৈরি হয়েছে ১৫০ মাইলেরও বেশি লম্বা টানেলের গোলকধাঁধা।
১৯৭৮ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে। আজ এই পাতালপুরী ইউরোপের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার মানুষ এই লবণ-সাম্রাজ্যের রহস্য উন্মোচনে নিচে নেমে আসেন। খনিটি মাটির নিচে মোট নয়টি স্তরে প্রায় ১ হাজার ৭৩ ফুট গভীর পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। যদিও এর মাত্র ২ শতাংশ এলাকা বর্তমানে জনসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে তবুও সেই ক্ষুদ্র অংশই পর্যটকদের বিমোহিত করার জন্য যথেষ্ট।
এখানে ভ্রমণের জন্য দুটি ভিন্ন পথ রয়েছে। পর্যটকরা চাইলে সাধারণ টুরিস্ট রুট বেছে নিতে পারেন যা প্রায় দুই মাইল দীর্ঘ এবং পাড়ি দিতে সময় লাগে দুই ঘণ্টা। আবার যারা রোমাঞ্চ পছন্দ করেন তারা বেছে নিতে পারেন মাইনার্স রুট বা খনি শ্রমিকদের পথ। এই পথে তিন ঘণ্টার অভিযানে পর্যটকদের মাথায় হেলমেট হাতে ল্যাম্প এবং কার্বন মনোক্সাইড শোষক যন্ত্র দেওয়া হয়।
পর্যটন রুটটি শুরু হয় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার মাধ্যমে। চাইলে লিফটও ব্যবহার করা যায়। সেখানে গোলকধাঁধার মতো সুড়ঙ্গপথগুলো পার হতেই দেখা পাবেন হাতে খোদাই করা বিশাল সব কক্ষের। বর্তমানে এই কক্ষগুলোতে রয়েছে অসংখ্য পাথুরে মূর্তি খোদাই করা শিল্পকর্ম এবং লবণের তৈরি বিশাল ঝাড়লন্ঠন।
ভিয়েলিৎস্কার এই দেয়ালগুলো ধূসর রঙের হবার কারণ হলো এখানকার সোডিয়াম ক্লোরাইড বা লবণ একদম বিশুদ্ধ নয়। এতে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ লবণ থাকলেও বাকিটা বালি পলি আর কাদার মিশ্রণ। এই খনিজগুলোর উপস্থিতির কারণেই দেয়ালগুলো ধূসর দেখায়। তবে এই লবণ খাওয়ার যোগ্য। প্রাচীনকালে খাবার সংরক্ষণের জন্য এই লবণ কোনো শোধন ছাড়াই ব্যবহার করা হতো। ভূতাত্ত্বিক ভাষায় এই খনিজ লবণকে হ্যালাইট বলা হয়। প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি বছর আগে প্রাচীন কোনো জলাশয় শুকিয়ে এই লবণের স্তর তৈরি হয়েছিল। পরে কার্পাথিয়ান পর্বতমালার টেকটোনিক নড়াচড়ার ফলে এই স্তরগুলো মাটির উপরিভাগের কাছাকাছি চলে আসে যা মানুষের জন্য খুঁজে পাওয়া সহজ হয়ে যায়। ১৭৪৩ সালে বারুদ ব্যবহারের আগ পর্যন্ত খনি শ্রমিকরা হাত দিয়ে এই সুড়ঙ্গ খুঁড়েছেন। এরপর সেখানে যান্ত্রিক ড্রিল ব্যবহার করা হয়।
ভিয়েলিৎস্কার ইতিহাস শুরু হয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে। প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ এখানকার ঝরনার পানি ফুটিয়ে লবণ সংগ্রহ করত। সেই লবণ তখন মুদ্রার মতো বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। চতুর্দশ শতাব্দীতে রাজা ক্যাসিমির দ্য গ্রেট এই খনিটির গুরুত্ব বুঝতে পারেন। তার সময়ে রাজকোষের আয়ের প্রায় এক তৃতীয়াংশ আসত এই খনি থেকে। এই অর্থ দিয়েই পোল্যান্ডের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে এখানে বছরে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টন লবণ উৎপাদিত হতো।
খনির ভেতরে কাজ করা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। তবে শ্রমিকদের মতে এখানকার বাতাস ছিল বেশ নির্মল আর পাথর ছিল তুলনামূলক নরম। তবে সব কাজ সহজ ছিল না। মিথেন গ্যাসের কারণে বিস্ফোরণ ঠেকাতে কিছু শ্রমিককে অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ করতে হতো যাদের বলা হতো পেনিটেন্টস। তারা জ্বলন্ত মশাল দিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতরে জমে থাকা মিথেন পুড়িয়ে ফেলতেন। ১৫০০ সালের দিকে খনিতে ঘোড়া নামানো হয় লবণের বোঝা উপরে তোলার চাকা ঘোরানোর জন্য। সেই দুর্ভাগা প্রাণীগুলো একবার নিচে নামলে আর কখনো দিনের আলো দেখতে পেত না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই খনিটিকে নাৎসি বাহিনীরা দখল করে উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় রূপান্তরিত করে। পাশের প্লাজো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিদের এখানে জোর করে শ্রমে নিয়োজিত করা হয়েছিল। তবে অত্যধিক আর্দ্রতার কারণে ধাতব যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য জায়গাটি উপযুক্ত ছিল না বলে সেই কার্যক্রম মাত্র কয়েক মাস স্থায়ী হয়েছিল। বর্তমানে লবণ উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পানির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পাম্প ব্যবহার করে পানি উপরে তোলা হয়। সেই লবণাক্ত পানি বা ব্রাইন শুকিয়ে এখনো বছরে ১০ হাজার টনের বেশি লবণ উৎপাদিত হচ্ছে।
ভিয়েলিৎস্কার পর্যটন প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতেও মানুষ এখানে আতশবাজি দেখতে বা ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত হ্রদে নৌকাভ্রমণ করতে আসত। পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস ১৪৯৩ সালে এখানে পর্যটক হিসেবে এসেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তার সম্মানে ১৯৭৩ সালে এখানে একটি লবণ খোদাই করা মূর্তি স্থাপন করা হয়। তবে পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো সেন্ট কিঙ্গা চ্যাপেল। এটি মাটির গভীরে খোদাই করা একটি বিশাল গির্জা। কিংবদন্তি অনুযায়ী হাঙ্গেরির রাজকন্যা কিঙ্গা পোল্যান্ডের এক ডিউকের সাথে বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে একটি লবণের খনি চেয়েছিলেন। তিনি তার আংটিটি হাঙ্গেরির একটি খনিতে ফেলে দেন এবং অলৌকিকভাবে সেই আংটিটি পরে পোল্যান্ডের ভিয়েলিচকার লবণের স্তূপের ভেতরে পাওয়া যায়। তিনজন দক্ষ খনি শ্রমিক দীর্ঘ ৬৭ বছর ধরে খোদাই করে এই গির্জাটি তৈরি করেছিলেন যা ১৯৬৪ সালে সম্পন্ন হয়। এখানে আজও ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং বিয়ের আয়োজন করা হয়।
আধুনিক সময়ে ভিয়েলিৎস্কা একটি বিনোদন কেন্দ্র। এখানকার বিশাল হলরুমগুলোতে কাঠের মেঝে বসানো হয়েছে যেখানে জমকালো অনুষ্ঠান করা যায়। এমনকি মাটির নিচে ৪৫০ ফুট গভীরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা স্পা রয়েছে যেখানে শ্বাসকষ্টের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। লবণের প্রাকৃতিকভাবে জীবাণুনাশক গুণ থাকায় এখানকার বাতাস অত্যন্ত বিশুদ্ধ এবং অ্যালার্জি রোগীদের জন্য উপকারী। খনি শ্রমিকরা এখানকার বাতাসের কারণে দীর্ঘজীবী হন এবং তাদের ফুসফুসের রোগ হয় না বললেই চলে।
বর্তমানে ভিয়েলিৎস্কাতে আর খনন কাজ হয় না ঠিকই কিন্তু এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখনো প্রায় ৩৮০ জন খনি শ্রমিক নিয়োজিত আছেন। তাদের প্রধান কাজ হলো লবণের অবকাঠামো যাতে ভেঙে না পড়ে সেজন্য পানি সরিয়ে ফেলা এবং কাঠের তৈরি মজবুত খুঁটি দিয়ে সিলিং সুরক্ষিত রাখা। মানুষের তৈরি এই বিস্ময়কর লবণের রাজ্যটি আজও পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আশ্চর্য হিসেবে টিকে আছে।
সূত্র: সিএনএন











