অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ
বেলফাস্টে ৩ বাংলাদেশি পরিবারের বাড়িতে হামলা

ছবি: রয়টার্স
উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্টে অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। এতে সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে উত্তর বেলফাস্টের টাইগার বে এলাকায় মুখোশধারী একদল ব্যক্তি অভিবাসী পরিবারের কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালায়। এর মধ্যে বাংলাদেশি তিনটি পরিবারের বাড়িও ভাঙচুর ও হামলার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলার সময় পরিবারগুলোর সদস্যরা ঘরের ভেতরেই ছিলেন। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলে তারা পুলিশের সহায়তা চান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। বর্তমানে তিন পরিবারের সদস্যরা অস্থায়ী আবাসনে আছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে এখনো নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেননি তারা।
বেলফাস্টে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিক মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘মঙ্গলবার রাত প্রায় ৯টার দিকে হঠাৎ করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিছু মুখোশধারী ব্যক্তি অভিবাসীদের বাড়িঘর লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। বাংলাদেশি তিনটি পরিবারের বাড়িতেও ভাঙচুর করা হয়। পরিবারগুলো খুব ভয় পেয়েছিল। পরে পুলিশ এসে তাদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যায়।’
হামলার শিকার এক বাংলাদেশি মোহাম্মদ মনসুর বললেন, ‘আমরা কল্পনাও করিনি এরকম কিছু হতে পারে। হঠাৎ দেখি কয়েকজন আমাদের বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছে। কিছুক্ষণ পর তারা দরজা-জানালায় আঘাত করতে শুরু করে। পরিস্থিতি এত দ্রুত খারাপ হয়ে যায় যে, আমাদের ঘর ছেড়ে বের হতে বাধ্য হতে হয়।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বাড়ির ভেতরে আমাদের প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসপত্র রয়ে গেছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও খুলতে পারছি না। পরিবার নিয়ে আমরা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। কবে বাসায় ফিরতে পারব, জানি না।’
স্থানীয় বাংলাদেশিরা জানালেন, সহিংসতার পর বেলফাস্টের বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যেসব এলাকা সাধারণত কর্মচঞ্চল থাকে, সেগুলোতেও মানুষের চলাচল কমে গেছে। অনেক অভিবাসী পরিবার নিরাপত্তার কারণে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। কেউ কেউ সাময়িকভাবে আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
২০১২ সাল থেকে বেলফাস্টে বসবাসরত রোকনুজ্জামানের ভাষ্য, ‘বেলফাস্ট সাধারণত শান্ত শহর। এত বছর ধরে এখানে আছি, কিন্তু এমন পরিস্থিতি আগে দেখিনি। হঠাৎ করে শহর জুড়ে ভয় ছড়িয়ে পড়ল। ঘটনাগুলো পরিকল্পিত কি না, তা আমরা জানি না। তবে অভিবাসী পরিবারগুলো এখন খুবই আতঙ্কিত।’
উত্তর বেলফাস্টে সোমবার রাতে ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির ওপর ছুরিকাঘাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। ওই ঘটনায় ৩০ বছর বয়সী সুদানি নাগরিক হাদি আলোদিদকে গ্রেপ্তার করে হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক অভিযোগে আদালতে হাজির করা হয়েছে। ছুরিকাঘাতের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অভিবাসীবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী বিক্ষোভের ডাক দেয়। পরে সেই বিক্ষোভ কয়েকটি এলাকায় সহিংসতায় রূপ নেয়।
সহিংসতার সময় মুখোশধারী ব্যক্তিরা বাড়িঘর, যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। কয়েকটি স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
ব্রিটেনের রাজনৈতিক নেতারা ঘটনাকে জাতিগত সংখ্যালঘু ও অভিবাসীদের লক্ষ্য করে চালানো হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী নাওমি লং বলেছেন, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বর্ণবাদী উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা বলছেন, তারা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবারের নিরাপত্তাকে। তারা চান, হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদে বাড়িতে ফেরার ব্যবস্থা করা হোক।
মোহাম্মদ মনসুর বললেন, ‘আমরা এখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করি। কোনো ধরনের সংঘাতে আমরা কখনোই জড়াইনি ৷ শুধু অভিবাসী হওয়ার কারণে যদি আমাদের পরিবারকে ভয় নিয়ে থাকতে হয়, তাহলে তো সেটা খুবই দুঃখজনক।’




