মুসলিমবিদ্বেষ থেকে সন্ত্রাসের ছক! ব্রিটেনে ভয়ংকর প্রবণতার হদিস গোয়েন্দাদের
- মসজিদ ও আশ্রয়কেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনা, উগ্রপন্থায় জড়াচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্করাও
- ঘৃণার আগুন ছড়াচ্ছে সমাজমাধ্যমে, ব্রিটেনে সন্ত্রাসের নতুন মুখ উগ্র ডানপন্থা

ব্রিটেনের মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মানুষ। আশ্রয়কেন্দ্রে নতুন জীবনের অপেক্ষায় থাকা পরিবার। তাদের নিরাপত্তা ঘিরেই এবার বিপদের নতুন সংকেত দিল দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা। অভিবাসী ও মুসলিমবিদ্বেষের বিষ কীভাবে হামলার পরিকল্পনায় রূপ নিচ্ছে, তার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-এর প্রধান কেন ম্যাককালাম।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) আরব নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ দিন লন্ডনে গোয়েন্দা সংস্থাটির সদর দপ্তরে বার্ষিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন তুলে ধরেন ম্যাককালাম। তার কথায়, ‘গত এক বছরে সবচেয়ে লক্ষণীয় প্রবণতা হলো, অভিবাসনবিরোধী ও মুসলিমবিদ্বেষী চরমপন্থী ক্ষোভ থেকে সন্ত্রাসী হামলার অভিপ্রায় তৈরি হওয়ার ঘটনা বেড়েছে।’ গোয়েন্দারা মসজিদ এবং অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা শনাক্ত করেছেন।
ম্যাককালাম জানিয়েছেন, গত ১ মে যুক্তরাজ্যের জাতীয় সন্ত্রাসী হুমকির মাত্রা ‘উল্লেখযোগ্য’ থেকে ‘তীব্র’ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। এর অর্থ, দেশে সন্ত্রাসী হামলা হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি। প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে এই প্রথম এমন সিদ্ধান্ত নেয় যৌথ সন্ত্রাসবাদ বিশ্লেষণ কেন্দ্র। এর পেছনে উগ্র ডানপন্থী সন্ত্রাসবাদের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বড় ভূমিকা রয়েছে। তবে সতর্কতা সব ধরনের সন্ত্রাসী হুমকির সম্মিলিত মূল্যায়ন।
গত ২৯ এপ্রিল লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রিনে ছুরিকাঘাতের ঘটনার পর হুমকির মাত্রা বাড়ানো হলেও সেটিই একমাত্র কারণ নয়। এমআই৫ জানিয়েছে, ইসলামপন্থী জঙ্গিবাদ এখনও প্রধান সন্ত্রাসী ঝুঁকি। তবে উগ্র ডানপন্থার বিস্তার নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। অভিবাসননীতি নিয়ে শান্তিপূর্ণ মতবিরোধ আর সহিংস হামলার পরিকল্পনা এক নয়। গোয়েন্দাদের নজর তাদের দিকে, যারা বিদ্বেষকে হামলার উদ্দেশ্যে পরিণত করছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক তরুণদের জড়িয়ে পড়া। ম্যাককালাম বলেছেন, অনলাইনে উগ্র মতাদর্শে প্রভাবিত ১৩ বছরের এক কিশোরকে কয়েক মাস আগে তদন্তের আওতায় এনেছিল এমআই৫। সেই অনুসন্ধান থেকে পাওয়া তথ্য কাজে লাগিয়ে বিদেশে প্রাণঘাতী হামলার একটি পরিকল্পনা ঠেকাতে সক্ষম হয় সহযোগী একটি দেশ।
স্কটল্যান্ডের ইনভারক্লাইডে আরেক কিশোর স্থানীয় ইসলামি কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা করেছিল। তদন্তে জানা যায়, সে অনলাইনে উগ্রপন্থায় প্রভাবিত হয়েছিল। গত বছরের আগস্টে তাকে দশ বছরের আটকাদেশ দেন আদালত। হামলা হওয়ার আগেই তাকে আটক করেছিল পুলিশ। আদালত তার আট বছরের বর্ধিত তত্ত্বাবধানেরও নির্দেশ দেন।
ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের হিসাবে, জুলাই পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্য ও সংশ্লিষ্ট দ্বীপাঞ্চলের মুসলিম উপাসনালয়ে হামলা ও বিদ্বেষমূলক ঘটনার সংখ্যা ৭৮। গড়ে প্রায় পাঁচ দিনে একটি ঘটনা। আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জায়গা ঘিরেও বিক্ষোভ ও সহিংসতার খবর এসেছে। ২০২৪ সালের সাউথপোর্ট-কাণ্ডের পর এই উত্তেজনা বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। পোর্টসমাউথে অভিবাসী থাকার সন্দেহে যে হোটেলে বিক্ষোভ হয়েছিল, সেখানে ছিলেন পাকিস্তানের সফররত ক্রিকেটাররা।
গোয়েন্দাপ্রধান অবশ্য বলেছেন, আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর হুমকিও অব্যাহত। পাশাপাশি রাশিয়া ও ইরানের রাষ্ট্রীয় তৎপরতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে উগ্রবাদ ছড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন তিনি।
ম্যাককালামের শেষ বার্তা আতঙ্ক ছড়ানো নয়, প্রস্তুতি নেওয়া। কারণ, বিদ্বেষ যখন পর্দার আড়াল থেকে বাস্তবের হামলায় পৌঁছায়, তখন লক্ষ্যবস্তু শুধু একটি মসজিদ কিংবা আশ্রয়কেন্দ্র নয়। প্রশ্নের মুখে পড়ে গোটা সমাজের নিরাপত্তা।



