ছুটির পাঠ
বিভেদের দেয়াল ভেঙে যেভাবে এক হয়েছিল জার্মানি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর সন্ধ্যা, পূর্ব বার্লিনের বর্নহোমার স্ট্রাসে সীমান্তচৌকির ক্যান্টিনে বসে ছিলেন ডিউটি শিফটের প্রধান হারাল্ড ইয়েগার। পূর্ব বার্লিন ও পশ্চিম বার্লিন বিভেদরেখা বার্লিন দেয়ালে ২৪ ঘণ্টার ডিউটিতে ছিলেন তিনি। ক্ষুধা লাগায় সহকর্মীদের ভিড় এড়িয়ে একা একটি টেবিলে বসে রুটি আর চা নিয়েছিলেন। ক্যান্টিনের এক কোণে চলছিল ছোট একটি টেলিভিশন। সেখানেই তিনি শুনছিলেন পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট সরকারের কর্মকর্তা গুন্টার শাবোভস্কির সংবাদ সম্মেলন।
শাবোভস্কি জানালেন, পূর্ব জার্মানির নাগরিকরা নতুন নিয়মে দেশের বাইরে যেতে পারবেন।
সাংবাদিকরা জানতে চাইলেন, নিয়মটি কবে থেকে কার্যকর হবে। কাগজপত্র দেখে শাবোভস্কি বললেন, ‘সোফোর্ট, আনফেরজুগলিশ’, অর্থাৎ ‘এখনই, বিলম্ব ছাড়াই’।
ইয়েগারের মুখের খাবার আটকে গেল। তার কাছে কথাটির প্রশাসনিক অর্থ ছিল পরিষ্কার। মানুষ কোনো শর্ত বা কাগজপত্র ছাড়াই সীমান্ত পার হতে পারবে! তিনি খাবার ফেলে উঠে সহকর্মীদের বললেন, ‘কী আজেবাজে কথা বলছে লোকটা!’ এরপরই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করলেন তিনি, কিন্তু কারও কাছ থেকেই স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পেলেন না।
টেলিভিশনের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বর্নহোমার স্ট্রাসেতে মানুষ জড়ো হতে শুরু করল। পূর্ব বার্লিনের মানুষ যেতে চাইছে পশ্চিমে। রাত যত বাড়তে থাকে, সীমান্তচৌকির সামনে ভিড় তত ঘন হয়। শেষ পর্যন্ত সেখানে জমে যায় হাজার হাজার মানুষ।
গুন্টার শাবোভস্কি সংবাদ সম্মেলনে তাড়াহুড়ো করে ঘোষণা দিলেও তৎকালীন পূর্ব জার্মানির নতুন ভ্রমণ নীতিমালার কাগজে পরিষ্কার লেখা ছিল, এর জন্য নাগরিকদের আগে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে আবেদন করতে হবে এবং পাসপোর্টের অনুমতি নিতে হবে।
কিন্তু শাবোভস্কির বলার ভুলে ছুটে এসেছে হাজারো মানুষ।
ইয়েগার তখন এক কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে। ওপরের কর্মকর্তারা তাকে গেট বন্ধ রাখতে বলছেন। অন্যদিকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো পশ্চিমে যাওয়ার দাবি জানাচ্ছিল।
২০১৪ সালে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্মরণ করেছিলেন, তার সামনে তখন ছিল শুধু দুটি পথ। কিছু না করা মানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার ঝুঁকি। আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি চালানোর কথা তিনি ভাবতেই পারেননি। ‘গুলি চালানো কোনো বিকল্প ছিল না’, বলছিলেন ইয়েগার।
রাত ১১টার দিকে যখন লোকের ভিড় সামলানো চাপ হয়ে দাড়াচ্ছিল, ইয়েগার শেষ পর্যন্ত গেট খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। বর্নহোমার স্ট্রাসে দিয়ে পূর্ব বার্লিনের মানুষের স্রোত পশ্চিমে ঢুকতে শুরু করে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। ২৮ বছর ধরে একটি শহরকে দুই ভাগ করে রাখা বার্লিন দেয়ালের পতনের দরজা খুলে যায় সেদিন রাতেই।
কিন্তু এই রাতের গল্প বুঝতে হলে যেতে হবে আরও ২৮ বছর পেছনে। শুধু তখনই জানা যাবে, এই মানুষের স্রোত কেন সেদিন বার্লিন দেয়ালের পতন ঘটিয়েছিল।
পরাজিত জার্মানি, বিভক্ত বার্লিন
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় পরাজিত জার্মানি ছিল ধ্বংসস্তূপ। রাজধানী বার্লিনের অবস্থাও ছিল ভয়াবহ। যুদ্ধের আগে শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ, যুদ্ধ শেষে সেখানে টিকে ছিল প্রায় ২৮ লাখ মানুষ। বিজয়ী চার শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন জার্মানিকে চারটি দখল অঞ্চলে ভাগ করে। একইভাবে বার্লিনকেও চারটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। তবে ছিল একটি অস্বাভাবিকতা। পুরো বার্লিনই ছিল সোভিয়েত-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের ভেতরে। ফলে শহরের পশ্চিম অংশে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের উপস্থিতি সোভিয়েত প্রভাববলয়ের ভেতরেই একটি পশ্চিমা দ্বীপ তৈরি করেছিল।
শুরুতে চার শক্তি মিলে বার্লিন পরিচালনা করলেও যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই তাদের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়তে থাকে। জার্মানির ভবিষ্যৎ, অর্থনীতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধ ক্রমে গভীর হয়। ১৯৪৮ সালে পশ্চিমা মিত্ররা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে মুদ্রা সংস্কার করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিম বার্লিনের স্থল ও নৌ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য শুরু করে বার্লিন এয়ারলিফট। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিমানযোগে পশ্চিম বার্লিনের মানুষের খাবার, কয়লা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়। এই সংকটের মধ্য দিয়েই বার্লিন শীতল যুদ্ধের (কোল্ড ওয়ার) অন্যতম প্রধান মঞ্চে পরিণত হয়।
১৯৪৯ সালে বিভক্তি আরও স্পষ্ট রূপ নেয়। পশ্চিমা দখল অঞ্চলগুলো নিয়ে গঠিত হয় ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি বা পশ্চিম জার্মানি।একই বছরের অক্টোবরে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে জন্ম নেয় জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক বা পূর্ব জার্মানি। পূর্ব বার্লিনকে করা হয় নতুন রাষ্ট্রের রাজধানী। একই শহরের দুই অংশ তখন দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে চলে যায়।
দেয়াল ওঠার আগের বার্লিন
তবু বার্লিন তখনো পুরোপুরি অবরুদ্ধ শহর নয়। পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মধ্যকার সেক্টর সীমান্ত দিয়ে চলাচল করা যেত। আর এই সুযোগটাই পূর্ব জার্মান সরকারের জন্য ক্রমে বড় সংকটে পরিণত হয়।
১৯৪৯ থেকে ১৯৬০ সালের শেষ পর্যন্ত ২৫ লাখের বেশি মানুষ পূর্ব জার্মানি ছেড়ে পশ্চিমে চলে যায়। তাদের বড় একটি অংশ ছিল তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ।
পশ্চিমে যাওয়ার এই প্রবাহ শুধু জনসংখ্যা কমাচ্ছিল না, পূর্ব জার্মানির অর্থনীতি ও দক্ষ জনশক্তির ওপরও চাপ তৈরি করছিল। পশ্চিম বার্লিন হয়ে পালানোর পথটি তাই পূর্ব জার্মান সরকারের কাছে ক্রমেই অসহনীয় হয়ে ওঠে।
১৯৫৩ সালে পূর্ব বার্লিনে শ্রমিকদের আন্দোলনও দেখিয়ে দিয়েছিল, রাষ্ট্রের ভেতরে অসন্তোষ কতটা গভীর। কাজের সময় ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দ্রুত রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়।
ওই বছরের ১৭ জুন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পূর্ব বার্লিনের রাস্তায় নামে। সোভিয়েত বাহিনী ও পূর্ব জার্মান নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলন দমন করে। বার্লিন তখন হয়ে ওঠে দুই রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংঘাতের সরাসরি মঞ্চ।১৯৫৮ সালে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ পশ্চিমা শক্তিগুলোকে পশ্চিম বার্লিন থেকে সরে যাওয়ার দাবি জানান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সেই দাবি মানেনি। ফলে বার্লিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এর মধ্যেই পূর্ব জার্মানি বুঝতে পারে, মানুষকে পশ্চিমে যাওয়া থেকে আটকানো ছাড়া দেশত্যাগের প্রবাহ থামানো কঠিন।
মানচিত্র এঁকে ব্যবচ্ছেদ
১৯৬১ সালের ১৩ আগস্ট ভোরে পূর্ব জার্মানির নিরাপত্তা বাহিনী পশ্চিম বার্লিনের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। রাস্তায় কাঁটাতার বসানো হয়, ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়। মানুষকে পশ্চিম বার্লিনে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সেই বাধাই পরবর্তী বছরগুলোয় পরিণত হয় বিশাল এক সুরক্ষিত সীমান্তব্যবস্থায়।
মজার বিষয় হলো, এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পূর্ব জার্মানির নেতা ওয়াল্টার উলব্রিস্ট প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘কারও দেয়াল নির্মাণের অভিপ্রায় নেই।’ অথচ ১৩ আগস্টের ভোরেই শুরু হয়ে যায় সেই দেয়াল তৈরির কর্মযজ্ঞ।
প্রথমে অস্থায়ী কাঁটাতার দেওয়া হলেও, পরে কংক্রিটের দেয়াল নির্মাণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত পশ্চিম বার্লিনকে ঘিরে তৈরি হয় প্রায় ১০৭ কিলোমিটার দীর্ঘ কংক্রিটের প্রাচীর। সঙ্গে বাকি লম্বা সীমান্তে নির্মাণ হয় ধাতব বেড়া এবং শত শত পর্যবেক্ষণ টাওয়ার।
১৩ আগস্ট সকালে বার্লিনের মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখল, তাদের শহরের পরিচিত পথগুলো রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কাঁটাতার, কোথাও সেনা। যে রাস্তা দিয়ে মানুষ প্রতিদিন কাজে যেত, সেটিই এখন সীমান্ত। কেউ পশ্চিম বার্লিনে কাজে গিয়েছিলেন, কিন্তু বাড়ি ছিল পূর্বে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন, আর ফিরে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
বার্লিন দেয়ালের সবচেয়ে নির্মম দিক ছিল এটাই। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে হঠাৎ করে নতুন নিয়মে ভাগ করে দিয়েছিল। একই পরিবারের সদস্যরা দুপাশে আটকে গেলেন। পরিচিত প্রতিবেশী, বন্ধু, কর্মস্থল, স্কুল, এমনকি বাড়ির সামনের রাস্তাও হয়ে গেল নাগালের বাইরে।
বার্নাউয়ার স্ট্রাসের একটি বাড়ির সামনের দরজা ছিল পূর্ব বার্লিনে, কিন্তু রাস্তার সামনের অংশ পড়ে গিয়েছিল পশ্চিম বার্লিনে। দেয়াল তৈরির পর সেই বাড়িগুলোও সীমান্তের অংশ হয়ে যায়। জানালা দিয়ে পশ্চিমে তাকানো যেত, কিন্তু সেখানে যাওয়া যেত না। পরে অনেক বাড়ি খালি করে দেওয়া হয়, জানালাগুলো ইট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।বার্লিন দেয়ালের সঙ্গে ছিল একাধিক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সীমান্তপথ, নজরদারি টাওয়ার এবং বিস্তৃত সীমান্ত এলাকা। এই দেয়াল অতিক্রম করে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ১৩৬ জন নিহত হওয়ার হিসাব দিয়েছে বার্লিনের সরকারি নথি। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় সংখ্যা ও গণনার পদ্ধতিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
দুই বার্লিনে দুই জীবন
এরপর প্রায় তিন দশক ধরে দুই বার্লিন আলাদা বাস্তবতায় বেঁচে ছিল। পশ্চিম বার্লিন ছিল পশ্চিমা বিশ্বের একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দ্বীপ। পূর্ব বার্লিন ছিল পূর্ব জার্মান রাষ্ট্রের কেন্দ্র। দুই পাশের মানুষের জীবনযাপন, অর্থনীতি, সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অধিকার ছিল ভিন্ন।
তবু দেয়ালের ওপারে আরেকটি জীবন আছে, এই অনুভূতি দুই পাশের মানুষের কাছেই ছিল বাস্তব। পশ্চিম বার্লিনে এসে ১৯৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি বলেছিলেন, ‘ইখ বিন আইন বার্লিনার’ অর্থাৎ ‘আমি একজন বার্লিনবাসী।’ তার বক্তব্য ছিল পশ্চিম বার্লিনের প্রতি পশ্চিমা শক্তিগুলোর সমর্থনের রাজনৈতিক প্রতীক।
অন্যদিকে পূর্ব জার্মানিতে দৈনন্দিন জীবন চলছিল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। মানুষের ভ্রমণ ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল সীমিত। একই সঙ্গে মানুষ নিজেদের মতো করে পরিবার, বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করেছিল। তাই পূর্ব জার্মানির ইতিহাসকে শুধু রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের গল্প হিসেবে দেখলে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
দেয়ালে প্রথম ফাটল
১৯৭০-এর দশকে দুই জার্মানির সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন আসে। পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্টের ওস্টপোলিটিক (পূর্ব নীতি) পূর্ব ইউরোপের সঙ্গে সংঘাত কমানো ও বাস্তব সম্পর্ক তৈরির দিকে এগোয়। ১৯৭১ সালের বার্লিন চুক্তি এবং পরবর্তী চুক্তিগুলো পশ্চিম বার্লিনে যাতায়াত ও যোগাযোগের কিছু সুযোগ বাড়ায়। বিভাজন তখনো ছিল, কিন্তু দুপক্ষ বুঝতে শুরু করে, এই বাস্তবতাকে সামলাতে হবে সংঘাতের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমেও।
কিন্তু দেয়ালের অস্তিত্বের মূল কারণটি রয়ে যায়। পূর্ব জার্মানির মানুষ তখনো স্বাধীনভাবে পশ্চিমে যেতে পারতেন না।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি এসে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ গ্লাসনস্ত (খোলামেলা নীতি) ও পেরেস্ত্রোইকার (সংস্কার) মাধ্যমে সোভিয়েত ব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ নেন।
এতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়। পূর্ব জার্মানিতেও মানুষ স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংস্কার ও ভ্রমণের অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামতে শুরু করে। ১৯৮৯ সালে লাইপজিগসহ বিভিন্ন শহরের আন্দোলন ক্রমে বড় হতে থাকে।নভেম্বরের শুরুতে পূর্ব বার্লিনে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ আলেক্সান্দারপ্লাৎসে সমাবেশ করে স্বাধীন মতপ্রকাশ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি জানায়। তখন আর আগের মতো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না পূর্ব জার্মানির সরকার।
‘বাঁধ ভেঙে দাও’
এ পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর নতুন ভ্রমণনীতির ঘোষণা আসে। যদিও সেই ভ্রমণনীতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ১০ নভেম্বর। কিন্তু শাবোভস্কির ভুল করে করা ‘অবিলম্বে’ মন্তব্য মানুষের কাছে কার্যত সীমান্ত খুলে দেওয়ার বার্তা হয়ে যায়। পশ্চিম জার্মানির টেলিভিশনও খবরটি প্রধান সংবাদ হিসেবে প্রচার করে। এরপর সীমান্তচৌকিগুলোয় মানুষের ঢল নামে।
বর্নহোমার স্ট্রাসেতে রাত ৯টা ২০ মিনিটের দিকে চাপ কমাতে কিছু মানুষকে পশ্চিমে যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু রাত ১১টা ৩০ মিনিট নাগাদ ভিড় এত বড় হয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত গেট তুলে দেওয়া হয়। পরের এক ঘণ্টায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ কোনো নিয়মিত পাসপোর্ট পরীক্ষা ছাড়াই পশ্চিম বার্লিনে ঢুকে পড়ে। পরে অন্য সীমান্তচৌকিগুলোও খুলে দেওয়া হয়।
সেদিন রাতে পুরো বার্লিন দেয়াল ভেঙে পড়েনি। কিন্তু তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শেষ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ বুঝে গিয়েছিল, তারা আর আগের মতো আটকে নেই।
পরবর্তী দিনগুলোয় সীমান্তপথ আরও খুলে দেওয়া হয়। মানুষ দেয়ালের ওপর উঠে উদযাপন করতে থাকে। কেউ হাতুড়ি দিয়ে কংক্রিটের টুকরো ভাঙে। সেই দৃশ্যের নাম হয়ে যায় ‘মাউয়ারশপেশটে’, অর্থাৎ ‘দেয়ালের কাঠঠোকরা’।
দেয়াল ভাঙলেও বিভাজন কি ভেঙেছে?
১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে একীভূত হলো। বার্লিন আবার একই দেশের রাজধানী হয়ে উঠল। সীমান্ত উঠে গেল, দুই জার্মানির আলাদা রাষ্ট্রব্যবস্থারও অবসান হলো। অর্থাৎ মানচিত্রে যে বিভাজন ছিল, সেটি শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু একটি দেশকে এক করা আর সেই দেশের মানুষের চার দশকের আলাদা অভিজ্ঞতা মুছে দেওয়া এক বিষয় নয়।
পূর্ব জার্মানির মানুষ প্রায় ৪০ বছর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে জীবন কাটিয়েছিলেন। পশ্চিম জার্মানিতে তখন গড়ে উঠেছিল ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ভিন্ন অর্থনীতি ও ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতা।
১৯৯০ সালে দুই অংশ এক হয়ে গেলেও মানুষের আয়, কাজের সুযোগ, সম্পদের মালিকানা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার পার্থক্য একসঙ্গে শেষ হয়ে যায়নি।
পুনর্মিলনের পর পূর্ব জার্মানির অর্থনীতি দ্রুত পশ্চিমের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়। অনেক পুরনো শিল্প বন্ধ হয়ে যায়, কর্মসংস্থান বদলে যায় এবং বহু তরুণ ও দক্ষ মানুষ পশ্চিমাঞ্চলে চলে যান। গত ৩৫ বছরে ব্যবধান অনেক কমলেও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০২৪ সালে পূর্বাঞ্চলের পূর্ণকালীন কর্মীদের গড় মাসিক আয় ছিল ৩ হাজার ৯৭৩ ইউরো, পশ্চিমাঞ্চলে ৪ হাজার ৮১০ ইউরো। অর্থাৎ পশ্চিমে গড় আয় এখনো প্রায় ২১ শতাংশ বেশি।পার্থক্য শুধু অর্থনীতিতে নয়, রাজনীতিতেও এর কিছু ছাপ রয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিমের মানুষের রাজনৈতিক মনোভাবের মধ্যে গত তিন দশকে অনেক মিল তৈরি হলেও রাজনৈতিক আস্থা ও প্রচলিত দলগুলোর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আবার কিছু ব্যবধান দেখা গেছে।
এর একটি উদাহরণ হলো অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি। ২০১৩ সালে গঠিত এই দলটি জার্মান রাজনীতির ডানপন্থী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিতগুলোর একটি। অভিবাসী কমানো, জাতীয়তাবাদ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমালোচনামূলক অবস্থানের মতো বিষয় দলটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমাঞ্চলের তুলনায় পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয় দলটির সমর্থন এখন অনেক বেশি।
দেশটির ফেডারেল ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজ্যে আলাদা নির্বাচন হয়, আবার পুরো দেশের জন্যও বুন্ডেসটাগ নির্বাচন হয়। ২০২৫ সালের বুন্ডেসটাগ বা পার্লামেন্ট নির্বাচনে পূর্ব জার্মানির পাঁচটি প্রধান রাজ্যেই এএফডি সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দল ছিল। ২০২৬ সালে স্যাক্সনি-আনহাল্ট ও মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নের রাজ্য নির্বাচনেও দলটি সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে।
তবে এএফডির এই সাফল্যকে সরাসরি বার্লিন দেয়ালের ফল বলা ঠিক হবে না। অর্থনীতি, অভিবাসন, নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অসন্তোষ এবং স্থানীয় সমস্যার মতো নানা বিষয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে। কিন্তু পূর্ব জার্মানির চার দশকের আলাদা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা যে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক মনোভাবকে প্রভাবিত করার একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।
দেয়ালের চিহ্ন
বর্তমানে বার্লিনে দেয়ালের অধিকাংশই টিকে নেই। কিন্তু তার রেখা আছে। বার্নাউয়ার স্ট্রাসের বার্লিন ওয়াল মেমোরিয়াল, ইস্ট সাইড গ্যালারি এবং শহরের বিভিন্ন জায়গায় সংরক্ষিত দেয়ালের অংশগুলো মনে করিয়ে দেয়, একসময় এই শহরের মাঝখান দিয়ে এমন একটি সীমান্ত চলে গিয়েছিল, যা মানুষের চলাচল, পরিবার ও ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করত।
২০২৬ সালের জার্মানিতে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের নেতৃত্বে সিডিইউ/ সিএসইউ ও এসপিডির জোট সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সাম্প্রতিক নির্বাচন দেখাচ্ছে, দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্র এখনো পুরোপুরি একরকম হয়নি। সেপ্টেম্বরে স্যাক্সনি-আনহাল্ট ও মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নের ফলাফল নিয়ে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে যে দেয়াল ভেঙে পড়েছিল, তার কংক্রিটের অংশ হয়তো আর নেই। কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিমের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার পার্থক্য এখনো জার্মানির অর্থনীতি, সামাজিক মনোভাব এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে কিছুটা দৃশ্যমান।
তবে এটাও সত্য, আজকের জার্মানি ১৯৮৯-এর জার্মানি নয়। পূর্বাঞ্চলের জীবনমান বহু ক্ষেত্রে উন্নত হয়েছে, আয় বৈষম্য কমেছে এবং দুই অংশের মানুষের মধ্যে বহু রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবধানও কমে এসেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে পূর্বাঞ্চলের পূর্ণকালীন কর্মীদের গড় মাসিক আয় পশ্চিমাঞ্চলের অর্ধেকেরও কম ছিল। ২০২৪ সালে সেই ব্যবধান নেমে এসেছে প্রায় এক-পঞ্চমাংশে।
হারাল্ড ইয়েগার সেদিন রাতে যে গেট খুলেছিলেন, সেটি খুলে দিয়েছিল একটি শহরের পথ। পরের বছর সেই পথ দিয়ে একটি দেশও আবার এক হয়ে যায়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের মানচিত্র এক করার চেয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা এক করা অনেক দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
আজ বার্লিনের রাস্তায় দেয়ালের ইট-পাথর খুব কমই দেখা যায়। কোথাও কোথাও শুধু মাটির ওপর একটি সরু রেখা। সেই রেখাটি মনে করিয়ে দেয়, একসময় এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল এমন একটি দেয়াল, যা বার্লিনবাসীকে বলেছিল, এই পাশ তোমার, ওই পাশ নয়।
তথ্যসূত্র: ডয়চে ভেলে, বিবিসি, জাপান টাইমস, বার্লিন ওয়েবসাইট









