অলি-গলিতে হাঁটু পানি, রাস্তাগুলো খাল
ডুবছে ব্যাংকক, ফুঁসছে জনগণ: বন্যায় চরম সংকটে থাইল্যান্ড

বৃষ্টি তো ব্যাংককের নতুন কিছু নয়। বর্ষাকালে কয়েক ঘণ্টার প্রবল বৃষ্টিতে শহরের রাস্তা নদীর মতো হয়ে যায়। নর্দমা থেকে ইঁদুর, আরশোলা উঠে আসে, আশ্রয় নেয় গাছ কিংবা উঁচু ভবনে। কিন্তু এ বার সেই চেনা ছবি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাস্তাঘাট পরিণত হয়েছে স্থির পানির হ্রদে। কোথাও কোমর সমান পানি, কোথাও ডুবে আছে গাড়ি। বাড়ি ফিরতে কেউ ব্যবহার করছেন ফোলানো ছোট নৌকা, আবার কোথাও ভাসমান ফ্রিজই হয়ে উঠেছে যাতায়াতের ভরসা।
দ্য গার্ডিয়ান- এর ৩ অক্টোবর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র দু’দিনে ব্যাংককের কিছু এলাকায় প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। লন্ডনে প্রায় ছয় মাসে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তার সমান বৃষ্টি নেমেছে এই অল্প সময়ে। বন্যায় সরকারি হিসাবে প্রায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের কয়েকজন পানিতে ডুবে এবং কয়েকজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন। শহরের ৫০ টি প্রশাসনিক এলাকাতেই বন্যা পরিস্থিতি ঘোষণা করা হয়েছে। ২৩০ টির বেশি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
উত্তর- পূর্ব ব্যাংককের খ্লং চান এলাকার ৭৩ বছরের বাসিন্দা সুলিমাস কুরাংকুল জানান যে, গত সপ্তাহে দিন- রাত টানা বৃষ্টি হয়েছে। পানি ক্রমেই বাড়তে থাকে। মোবাইলে সতর্কবার্তা পাওয়ার সময় অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। তখন রাস্তায় কোমর সমান পানি। পরে পানি কিছুটা নামলেও দুর্গন্ধ, আবর্জনা ও ভাসমান বর্জ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
চাও ফ্রায়া নদীর বিশাল বন্যাপ্রবণ সমভূমির উপর গড়ে ওঠা ব্যাংকক পানি নামাতে খাল, পাম্প ও বাঁধের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু অপরিকল্পিত কংক্রিট নির্মাণে খালের বড় অংশ নষ্ট হওয়ায় শহরের জল নিকাশি ব্যবস্থা চাপ সামলাতে পারছে না। ব্যাংককের প্রধান সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরেও এর প্রভাব পড়েছে। একসময় থাই এয়ারওয়েজের প্রায় অর্ধেক কর্মী কাজে পৌঁছাতে পারেননি। ফলে হাজার হাজার লাগেজ জমে যায়, বাতিল হয় একাধিক উড়ান। বহু স্কুল বন্ধ হয়েছে এবং যানজটে কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন অনেকে।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল জানিয়েছেন যে, উত্তরের দিক থেকে আসা পানিতে ব্যাংককের বিপদ এখনও কাটেনি। পরিস্থিতি নজরে রাখতে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া দফতর আগামী সপ্তাহেও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ায় চরম বন্যা বাড়ছে। সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানী নিকোলাওস স্ক্লিরিস বলেন, মধ্য থাইল্যান্ডে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টির প্রবণতা ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়তে পারে।
কোপারনিকাস ক্লাইমেট পালসের তথ্য অনুযায়ী, অস্বাভাবিক উষ্ণ দক্ষিণ চিন সাগর থেকে একটি নিম্নচাপ কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম পেরিয়ে ব্যাংককের উপর আটকে যাওয়ায় এই বৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবও রয়েছে। বিশেষজ্ঞ নাইম লায়েনির মতে, শহরের খাল প্রতি ঘণ্টায় সাধারণত প্রায় ৬০ মিলিমিটার, উন্নত অংশে সর্বোচ্চ ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি সামলাতে পারে। কিন্তু এবার তার চেয়েও বেশি বৃষ্টি হয়েছে এবং পরপর বৃষ্টির মধ্যে পানি নামার সময়ও পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে মিয়ানমারেও একই আবহাওয়া ব্যবস্থায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস হয়েছে। দক্ষিণের কা দেত নে হতেন গ্রামে ভূমিধসে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, আরও আটজন নিখোঁজ।
ব্যাংককে এখন পাম্পগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চলছে। তবে পুরো পানি নামতে আরও কয়েকদিন লাগতে পারে বলে জানা যায়। সুলিমাসের কথায়, পরিস্থিতি কঠিন হলেও প্রতিবেশীরা একসঙ্গে লড়ছেন। তাঁর বিশ্বাস, একসঙ্গে থাকলেই এই বিপদ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।




