লুটেরা অর্থনীতি থেকে পুনর্জাগরণের পথে বাংলাদেশ, সরকারের আশু করণীয়

ছবি : এআই
দেশে গত দেড় দশকে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধির কথা বললেও অর্থনীতির ভেতরে জমেছে নানা কাঠামোগত দুর্বলতা। ব্যাংক খাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণের বিস্তার, অর্থ পাচার, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের মতো সমস্যাগুলো অর্থনীতির ভিত্তিকে নড়বড়ে করে তুলেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি জবাবদিহিমূলক ও উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
বাংলাদেশ ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে, বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাব অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে কাজ করেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ সরকারি হিসাবে কয়েক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও বাস্তবে পুনঃতফসিল ও অবলোপনের মাধ্যমে গোপন থাকা ঋণ যুক্ত করলে এর পরিমাণ আরও অনেক বেশি বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।
অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, যা পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, দুর্বল তদারকি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের প্রতি নমনীয়তা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে বর্তমান সরকারের উচিত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করা। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও সম্পদ জব্দের ব্যবস্থা করা জরুরি। ব্যাংকিং ব্যবস্থার তদারকি জোরদার করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। মনে রাখতে হবে, ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী না হলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কোনোটিই টেকসই হবে না।
অর্থনীতির অন্যতম বড় ক্ষত হলো অর্থ পাচার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। এই অর্থ যদি দেশের ভেতরে বিনিয়োগ হতো, তাহলে শিল্প, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারের উচিত পাচারকৃত অর্থ শনাক্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, সন্দেহজনক সম্পদের স্বাধীন নিরীক্ষা পরিচালনা করতে হবে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও কার্যকর সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে এবং দেশের মুদ্রানীতিকে আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী করতে হবে। এর পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে সাধারণ মানুষেকে স্বস্তি দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।
দেশি বিদেশী বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং দুর্নীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হলে সরকারকে ওয়ান স্টপ সার্ভিস কার্যকর করতে হবে। ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি আইন ও নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া শিল্প কারখানার চাকা সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একটি মাত্র খাতের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও শিল্পায়নে জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এই লক্ষ্যে সরকারকে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল শিল্প এবং জাহাজ নির্মাণ ও সমুদ্র অর্থনীতির মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ দেশের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক সংকটে আরও সহনশীল করবে।
প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে বাড়ছে না, যার ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে নজর দিতে হবে। এজন্য কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং শিল্পের বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন করা প্রয়োজন। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল সম্পদে পরিণত করতে না পারলে এই জনমিতিক সুবিধা অচিরেই জনমিতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে।
রাজস্ব সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ ছাড়া দেশের উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতি সংস্কারে সরকারের উচিত কর প্রশাসনের সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করা। কর ফাঁকি ও কর অব্যাহতির অপব্যবহার বন্ধ করার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ করের পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা আবশ্যক।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে দেশে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থ পাচার রোধ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারলেই অর্থনীতির প্রকৃত পুনর্জাগরণ সম্ভব। বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, সম্ভাবনাও তেমনি বিশাল। সঠিক নীতি, দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে দেশ আবারও উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক একটি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরে যেতে পারে। আর তখনই প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের এক নতুন অধ্যায় রচিত হবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
[email protected]




