২২ লাখ কোটির ঋণ সামলাতে মার্কিন সহায়তা চায় বাংলাদেশ
- ঋণ ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহায়তার আশ্বাস মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের
- মার্কিন সহায়তা চাওয়ার উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৫ সালে
- মার্কিন সহায়তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকারের আয়-ব্যয়ের আগাম হিসাব তৈরি

বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ ২২ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই বিপুল ঋণের চাপ সামলাতে এবং ভবিষ্যতে কম খরচে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে সরকার। ঋণের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, সরকারি বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ এবং সরকারের আয়-ব্যয়ের আগাম হিসাব তৈরিতে কারিগরি সহায়তা দেবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ।
গতকাল বুধবার ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক বৈঠকের ফাঁকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ব্যাংককের কুইন সিরিকিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল এতে অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপসহকারী কর্মকর্তা রবার্ট কাপরোট। প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে ঋণ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বললেন, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে ঋণ ব্যবস্থাপনাসহ দুই দেশের সার্বিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান, জ্বালানি তেল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করছে। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা এবং এক্ষেত্রে মার্কিন সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আগামীর সময়কে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে দেশটি সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের সহায়তা
বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ঋণের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, বার্ষিক ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা, সরকারি বন্ডের বাজার উন্নয়ন এবং ঋণের সুদ ও পরিশোধের সময় বিবেচনায় কৌশল তৈরিতে সহায়তা দেবে। পাশাপাশি সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ, কখন কত টাকা প্রয়োজন হবে তার পূর্বাভাস, ঋণ ব্যবস্থাপনার আইন ও নীতিমালা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের পদ্ধতি শক্তিশালী করার বিষয়ও রয়েছে।
সহজভাবে বললে, সরকারের কখন কত টাকা প্রয়োজন হবে, কোথা থেকে ঋণ নিলে খরচ কম হবে এবং পুরনো ঋণের সুদ ও আসল কখন পরিশোধ করতে হবে— এসবের আগাম পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র। এতে হঠাৎ অর্থসংকট দেখা দিলে বেশি সুদে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। সরকারি বন্ডের বাজার উন্নত হলে বিভিন্ন মেয়াদে অর্থ সংগ্রহের সুযোগও বাড়তে পারে।
সরকারি ঋণ ২২ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া ঋণ ৮ লাখ ৮২ হাজার কোটি, সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংকবহির্ভূত উৎসের ঋণ ৪ লাখ ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি এবং বিদেশি ঋণ ৯ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা।
সরকার ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও সরকারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে দেশের ভেতর থেকে ঋণ নেয়। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণও ব্যবহার করে। এসব ঋণের সুদ ও আসল নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে হয়। ঋণ পরিশোধে সরকারের বেশি অর্থ ব্যয় হলে উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যেতে পারে। বিদেশি ঋণ পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হওয়ায় দেশের বৈদেশিক লেনদেনেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
আগাম পরিকল্পনায় কমতে পারে ঋণের খরচ
মার্কিন সহায়তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকারের আয়-ব্যয়ের আগাম হিসাব তৈরি। কখন কত রাজস্ব আসবে, কী পরিমাণ ব্যয় হবে এবং কখন কত ঋণ পরিশোধ করতে হবে— এসব তথ্য আগে থেকে জানা থাকলে প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা সহজ হবে। এতে শেষ মুহূর্তে বেশি সুদে ঋণ নেওয়ার চাপ কমতে পারে।
এ ছাড়া কোন উৎস থেকে ঋণ নিলে সুদ কম দিতে হবে, কোন ঋণের মেয়াদ বেশি সুবিধাজনক এবং ভবিষ্যতে কোন ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়তে পারে, তা আগেই যাচাই করা সম্ভব হবে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, সুদহার ও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ওপর।
২০২৫ সালে শুরু হয় উদ্যোগ
বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে মার্কিন সহায়তা চাওয়ার উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি। তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টকে চিঠি দিয়ে পাঁচটি ক্ষেত্রে সহায়তা চান। এর মধ্যে ছিল সরকারি অর্থের প্রবাহের পূর্বাভাস, আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ, ঋণ ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও রাজস্ব প্রশাসনের উন্নয়ন।
এরপর দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ভার্চুয়াল মূল্যায়ন করে। এর ভিত্তিতে ৩ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রকল্পের নকশা তৈরির কাজ শুরুর সম্মতি জানানো হয়। চলতি বছরের জুনে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে। সর্বশেষ গত ২৪ জুলাই অর্থ সচিবকে পাঠানো চিঠিতে প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদনের বিষয়টি জানানো হয়।
এখন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ হলো কাজের পরিধি বা কার্যপরিধি (টিওআর) চূড়ান্ত করা এবং দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্বাক্ষর। অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ শিগগিরই কার্যপরিধির খসড়া পাঠাবে। সেটি পর্যালোচনার পর চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করা হবে।
অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারও উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছেন। তার মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তবে শুধু কারিগরি সহায়তা পেলেই ঋণের চাপ কমবে না। এর সুফল পেতে সরকারের আয় বাড়ানো, ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনা এবং পরিকল্পিতভাবে ঋণ নেওয়া জরুরি।



