আগামীর সময়

হাম নিয়ে হিমশিমে হাসপাতাল

হাম নিয়ে হিমশিমে হাসপাতাল

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছে ৫ হাজার ৭৯২ শিশু। এদের মধ্যে ১০৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যদিও অধিদপ্তরের ভাষ্য, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল মাত্র ৯ জন। এ অবস্থায় হাসপাতালে যারা চিকিৎসাধীন আছে, তাদের চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।

পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার ছুটি ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। চট্টগ্রামসহ অন্যান্য উপদ্রুত এলাকায় বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামীকাল রবিবার থেকে সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার।

অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যের বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংক্রমণের শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। ঢাকার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ঘুরেও মিলেছে এ তথ্যের সত্যতা। বেশিরভাগ হাসপাতালে শয্যাসংখ্যার চেয়ে বেশি রোগী। অনেক হাসপাতালের মেঝেতেই চলছে এই সংক্রামক রোগটির চিকিৎসা।

হাসপাতালে মিলছে না সব সেবা

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামকব্যাধি হাসপাতালে (আইডিএইচ) সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, করিডরজুড়ে মেঝেতে পাতা বিছানায় চলছে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা। কষ্টে কাতর শিশুদের বাবা-মার চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা-উদ্বেগ। হাসপাতালটিতে শয্যা না পেয়ে কোনো কোনো অভিভাবক সন্তানকে নিয়ে ছুটছেন অন্য হাসপাতালে।

আইডিএইচে দুই মেয়েকে ভর্তি করিয়েছেন কেরানীগঞ্জের পারভেজ মিয়া। প্রথমে বড় মেয়ের পর আক্রান্ত হয় তার ছয় মাস বয়সী ছেলেটিও, এখন হামের উপসর্গ নিয়ে লড়ছে। তিনদিন আগে তাদের ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে। এখনো সেখানেই আছে তারা।

পারভেজ গত তিনদিন হাসপাতালে দেখা পরিস্থিতির বর্ণনা করছিলেন আগামীর সময়ের কাছে। তার ভাষায়, ডাক্তার-নার্সরা জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছেন, রোগী ও তার স্বজনদের সঙ্গেও খুব আন্তরিক ব্যবহার করছেন। কিন্তু উপকরণ সংকটের কারণে শতভাগ সেবা নিশ্চিত করতে পারছেন না তারা। নিরুপায় হয়ে তারা অনেক কিছু বাইরে থেকে করিয়ে আনতে বলেন।

পারভেজ বলেছেন, ‘আমার বাচ্চাকে যখন ভর্তি করি, তখন হাসপাতালে নার্সসংখ্যা কম থাকার কারণে তার হাতে ক্যানোলা লাগানোর মতো কেউ ছিলেন না। বাধ্য হয়ে কোলের বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালের বাইরে গিয়ে ক্যানোলা লাগিয়ে আনতে হয়েছে।’

হাসপাতালটির এক জ্যেষ্ঠ নার্স পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেছেন, ‘সচরাচর এখানে হাতে গোনা রোগী থাকে, কিন্তু এবার যা হচ্ছে তা অকল্পনীয়। শিশুদের হামের সঙ্গে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া দেখা দিচ্ছে। আমরা যখন দেখি, মাসুম বাচ্চারা শ্বাস নিতে পারছে না, তখন মানসিকভাবে খুব কষ্ট হয়, কিন্তু কাজ তো করতেই হবে।’

পরিস্থিতি কেন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য বলছে, গত দুই বছরে নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় সাধারণ টিকাদানের হার কমেছে। বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে প্রতি চার বছর অন্তর বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন করা হয়। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালে। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনজনিত পরিস্থিতির কারণে ২০২৪ সালের নির্ধারিত ক্যাম্পেইনটি পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া গত বছর গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘটের কারণে অন্তত তিনবার নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। ফলে টিকা না পাওয়া শিশুরাই আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আর বিলম্ব করে তাদের হাসপাতালে আনার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্য, বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের ক্ষেত্রে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সেটাই প্রাথমিক কারণ। দেশের ৫৬ জেলায় হাম ছড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে, ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক এ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও পরামর্শ

হাম একটি চরম ছোঁয়াচে রোগ। পরিবারের একজনের হলে অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রবল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন শুক্রবার সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিতে স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। দ্রুত টিকা দিতে হবে। যেটি সরকার রবিবার থেকে শুরু করছে।’

হাসপাতালে হাম নিয়ে আসছে এমন রোগীর বাড়ির আশপাশে গিয়ে নতুন রোগী শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘টিকাদানে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট কাটাতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের পাশাপাশি দক্ষতার ভিত্তিতে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় দায়িত্ব দিতে হবে। একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে কমিউনিটির সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।’

জরুরি টিকাদান কর্মসূচি

উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে সরকার। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, প্রাথমিকভাবে বেশি আক্রান্ত এলাকায় দুই সপ্তাহব্যাপী এই কার্যক্রম চলবে। ইতিমধ্যে ২০ থেকে ২১টি উপজেলা চিহ্নিত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল

গত বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত কুমার বিশ্বাস বলেছেন, ‘রাজধানীসহ সারাদেশে হামের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও সবাই হামে আক্রান্ত নয়। পরীক্ষা করে যারা হামে আক্রান্ত, তাদের জন্য চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।’

    শেয়ার করুন: