ভর্তুকি বন্ধে ভাড়া দ্বিগুণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকার নাটক সরণির বাংলাদেশ মহিলা সমিতির ড. নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে নাটক মঞ্চায়নের জন্য আগে এক শিফটে ভাড়া দিতে হতো ৫ হাজার টাকা। তবে গত জানুয়ারি থেকে নাট্যদলগুলোকে একই শিফটের জন্য গুনতে হচ্ছে ১১ হাজার ৫০০ টাকা। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভর্তুকি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেড়েছে এই ব্যয়। এতে আর্থিক চাপে পড়েছে নাট্যদলগুলো, কমেছে মিলনায়তনে নাটক মঞ্চায়নের আগ্রহও।
মহিলা সমিতির মঞ্চে নাট্যচর্চা অব্যাহত রাখতে দ্রুত ভর্তুকি পুনর্বহালের প্রয়োজন বলে মনে করেন নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নাট্যচর্চার নবযাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত মহিলা সমিতির মঞ্চকে ঘিরে। ফলে মহিলা সমিতির মঞ্চে নাট্যচর্চার যে ঐতিহ্য, তা ধরে রাখতে সরকারের উদ্যোগী হওয়া জরুরি।’ তিনি সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে ভর্তুকি আবার চালুর আহ্বান জানিয়েছেন।
অভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক আজাদ আবুল কালাম মনে করেন, মহিলা সমিতি মঞ্চের ঐতিহ্য ধরে রাখা মানে ইতিহাসকে সম্মান করা। তিনি বললেন, ‘একসময় মহিলা সমিতির মঞ্চকে ঘিরে দেশের নাট্যচর্চার যে নবযাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য সরকার, নাট্যকর্মী এবং মহিলা সমিতি কর্তৃপক্ষকে একযোগে ভূমিকা রাখতে হবে।’ বাড়তি ভাড়ার কারণে প্রদর্শনীর খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক নাট্যদল সেখানে নাটক মঞ্চায়নে আগ্রহ হারাচ্ছে বলেও জানালেন আজাদ আবুল কালাম। তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের হৃৎপিণ্ড তো মহিলা সমিতির মঞ্চ। এই মঞ্চটা রক্ষা করা ইতিহাসের দায়। সেই দায় মেটানো সবার দায়িত্ব।’
১৯৭৩ সালে মহিলা সমিতির মঞ্চে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের হাত ধরে বাংলাদেশে টিকিট কেটে নাটক দেখার সংস্কৃতির সূচনা হয়। নাট্যদলগুলোর কর্মচাঞ্চল্যে মুখর এই সড়কের নাম ২০০৫ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা আনুষ্ঠানিকভাবে রাখেন ‘নাটক সরণি’।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে মহিলা সমিতি মিলনায়তনে নাটক মঞ্চায়নের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বেশি ভাড়ার কারণে অনেক নাট্যদল এখন এখানে প্রদর্শনী করতে আগ্রহী নয় বলে মনে করছে মহিলা সমিতি কর্তৃপক্ষও। গত ২৩ থেকে ২৫ জুলাই মহিলা সমিতি মিলনায়তনে ‘গোলমাথা আর চোখামাথা’ নাটকের প্রদর্শনী করে নাট্যদল ‘স্পর্ধা’। দলটির কয়েকজন নাট্যকর্মী জানিয়েছেন, প্রতিটি শিফটের জন্য তাদের ১১ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে। টিকিট বিক্রি করে প্রদর্শনীর খরচ তুলে আনাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা সমিতির ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা গাজী ফিরোজ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘গত জানুয়ারি থেকে মন্ত্রণালয়ের ভর্তুকি বন্ধ হওয়ায় নাট্যদলগুলোকে এখন পুরো ভাড়াই পরিশোধ করতে হচ্ছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে নাট্যদলগুলোর জন্য বিশেষ ভাড়ার ব্যবস্থা চালু ছিল। মিলনায়তনের নির্ধারিত ভাড়া ১১ হাজার ৫০০ টাকা হলেও নাট্যদলগুলো দিত ৫ হাজার টাকা। বাকি ৬ হাজার ৫০০ টাকা সরকার ভর্তুকি হিসেবে বাংলাদেশ মহিলা সমিতিকে পরিশোধ করত।’
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির ড. নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে নাটক মঞ্চায়নে প্রণোদনা বাবদ সরকারি অনুদান চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। তবে অক্টোবর পর্যন্ত ওই আবেদনের বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সমিতি কর্তৃপক্ষ। আবেদনে প্রতি মাসে ২০টি প্রদর্শনীর জন্য প্রণোদনা চাওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রদর্শনীর বিপরীতে ৬ হাজার ৫০০ টাকা হিসাবে ১১ মাসের জন্য মোট ১৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমার কাছে এমন কোনো আবেদন আসেনি। আমি এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নেব। আমরা তো চাই নাট্যচর্চার ধারা অব্যাহত থাকুক। কেন এই বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে, তা খোঁজ নিয়ে জানব।’



