সৌদিতে হুতিদের হামলায় বন্ধ ৮২ ফ্লাইট, বিপাকে ১৩ হাজার যাত্রী
- বিকল্প রুট থাকলেও খালি নেই আসন
- অনিশ্চয়তায় হাজার হাজার ওমরাহযাত্রী
- শাহজালালের একগুচ্ছ নির্দেশনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হুতি হামলায় একে একে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবের পাঁচটি বিমানবন্দর। নিহত হয়েছেন বাংলাদেশিসহ ২০ জন। এর মধ্যে দেশটির রাজধানী রিয়াদের বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১০ অক্টোবর থেকে বন্ধ। দাম্মাম, আবহাসহ আরও চারটির কার্যক্রম সীমিত। যতটুকু অপারেশন চলছে, তাতেও রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। এতে রিয়াদ, দাম্মামসহ তিনটি পথে বাংলাদেশিদের যাতায়াত বেশি থাকায় বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী। আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে তৈরি হয়েছে কাজ হারানোর শঙ্কা, হতাশায় ভুগছেন ওমরাহযাত্রীরা। তবে দাম্মাম, জেদ্দাসহ বিকল্প রুটে যাওয়া যাচ্ছে সৌদি, রয়েছে টিকিট সংকট।
বিরাজমান নিরাপত্তা সংকটেও জেদ্দা, মদিনা ও দাম্মামে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এবং সাউদিয়া এয়ারলাইনস। কিন্তু এসব ফ্লাইটে পর্যাপ্ত আসন খালি না থাকায় যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না আটকে পড়া যাত্রীরা। আবার হঠাৎ করে ফ্লাইটের সংখ্যাও বাড়ানো যাচ্ছে না বলে জানালেন কর্মকর্তারা। ফলে যাদের জরুরি প্রয়োজনে সৌদি আরব যাওয়ার কথা, বিশেষ করে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা, তাদের অনেকের মধ্যেই বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা।
ইউএস-বাংলার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, রিয়াদগামী যাত্রীরা চাইলে তাদের টিকিট বাতিল বা রিশিডিউল করতে পারবেন। চাইলে জেদ্দাগামী কোনো ফ্লাইটেও যেতে পারবেন। তবে ইউএস-বাংলার জেদ্দাগামী কোনো ফ্লাইটে এই মুহূর্তে খালি নেই আসন। ‘আর চাইলেও হঠাৎ করে ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো সম্ভব নয়। ফ্রিকোয়েন্সি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর থেকে শিডিউল নিতে হবে, যা একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার’— উল্লেখ করলেন তিনি।
বিমানের দাম্মামগামী ফ্লাইটও বন্ধ
বিমান এতদিন শুধু রিয়াদগামী ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করলেও গতকাল মঙ্গলবার দাম্মামগামী ফ্লাইটও স্থগিত করেছে। বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা থেকে দাম্মামগামী এবং ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় ও তারিখ অনুযায়ী) স্থগিত করেছে বিমান। ফ্লাইটগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও যাত্রার সময়সূচির হালনাগাদ তথ্য যথাসময়ে জানানো হবে। জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরবে যাতায়াত এবং বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন। এক্ষেত্রে টিকিট ও ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য নিকটস্থ বিমান সেলস সেন্টারে যোগাযোগ করতে হবে।
সাউদিয়া এয়ারলাইনসের এজেন্ট ‘প্রাচুর্য হলিডে’র মার্কেটিং অফিসার পলাশ আগামীর সময়কে বলেছেন, অনেক যাত্রী বিদেশ থেকে ছুটি কাটাতে দেশে আসেন। সেক্ষেত্রে অনেকে ফিরতি টিকিট কেটেই দেশে আসেন। তারাই বেশি সংকটে পড়েছেন। এ ছাড়া সাউদিয়া এয়ারলাইনসের যাত্রীদের মধ্যে যারা রিয়াদগামী ফ্লাইটের টিকিট কেটেছিলেন, তাদের টিকিট রিশিডিউল করা হচ্ছে। পাশাপাশি তারা চাইলে আসন খালি থাকা সাপেক্ষে জেদ্দাগামী ফ্লাইটে যেতে পারছেন। কিন্তু জেদ্দাগামী ফ্লাইটে চলতি মাসের সব আসন বুকড।
এ পর্যন্ত বাতিল ও স্থগিত ৮২ ফ্লাইট
হুতি হামলার কারণে শনিবার রাত থেকে গতকাল বিকাল পর্যন্ত রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দাগামী কমপক্ষে ৮২টি ফ্লাইট বাতিল এবং স্থগিত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৭১ যাত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল। গতকাল বিকালে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে এ তথ্য। বেবিচক, হজ অ্যাসোসিয়েশন ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দিনে ৭ থেকে ৯ হাজার বাংলাদেশি যাতায়াত করে সৌদি-বাংলাদেশ রুটে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার নতুন চাকরি নিয়ে সৌদিতে পাড়ি জমান। প্রতিদিন দেড় থেকে আড়াই হাজার বাংলাদেশি যান ওমরাহ পালনে। অন্যদিকে সৌদি আরব থেকে ছুটিতে দেশে ফেরেন আরও দুই থেকে আড়াই হাজার। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত এখন অনিশ্চয়তায়। এর মূল কারণ ফ্লাইট সূচিতে বিপর্যয়।
১৯ অক্টোবর বিমানের ফ্লাইটে দাম্মাম বিমানবন্দর হয়ে নিজ কর্মস্থলে ২১ অক্টোবর যোগ দেওয়ার কথা কক্সবাজারের শাহাদাতুল আমিনের। তিন মাস ছুটি শেষে তিনি সৌদি ফিরতেন। এখন দাম্মাম রুটে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। বললেন, ‘এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগেভাগেই শারজাহ, মাস্কাটের ট্রানজিট ফ্লাইটে চড়েই দাম্মাম যাব। কিন্তু এই টিকিটের তো চড়া দাম। আমার নিজের টিকিটও তো রিফান্ড নিতে পারছি না।’
প্রবাসে কর্মসংস্থান প্রক্রিয়ায় জড়িত এজেন্সিদের সংগঠন বায়রার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবু জাফর বললেন, ‘আমার নিজের প্রতিষ্ঠানের ১২ কর্মী রিয়াদ যেতে পারেননি। এয়ারপোর্ট বন্ধ, অপেক্ষা করা ছাড়া তো বিকল্প নেই। সরকার যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে মেয়াদ শেষ হওয়া কর্মীদের সময় বাড়াতে পারে, তাহলে অনিশ্চয়তা উদ্বেগ কিছুটা কমবে।’
সৌদির কঠোর শ্রম আইন অনুযায়ী, ভিসার মেয়াদ শেষ হলে কফিল বা নিয়োগকর্তারা সহজেই কর্মক্ষেত্র থেকে পালানোর রিপোর্ট ফাইল করতে পারেন। এমন রিপোর্ট হলে কর্মীর চাকরি তো যাবেই, ভবিষ্যতে সৌদিতে প্রবেশও নিষিদ্ধ হতে পারে। এ ছাড়া ভিসার মেয়াদ বাড়াতে কর্মীপ্রতি বাড়তি ১০০ ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে, যা বহন করা সাধারণ শ্রমিকের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।
হাব চট্টগ্রামের সাবেক প্রেসিডেন্ট শাহ আলম জানালেন, আতঙ্কে অনেকেই সৌদি যাত্রা স্থগিত করেছেন। দিন যত যাবে এ সংখ্যা বাড়বে। এখন সাউদিয়া, বাংলাদেশ বিমানের মতো এয়ারলাইনস যদি যাত্রা বাতিল করে, তাহলে যাত্রী রিফান্ড বা টাকা ফেরত পাবেন। কিন্তু বাজেট এয়ারলাইনসের (কম ভাড়া) টিকিট হলে টাকা ফেরতের সম্ভাবনা কম।
শাহজালালের নির্দেশনা
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ঢাকা থেকে ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইনসগুলোকে যাত্রীদের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানানো, খাবার-পানির ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার নির্দেশ দিয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
গত ১২ অক্টোবর রাতে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি আরবে সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব এয়ারলাইনসকে অবিলম্বে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ।
এতে বলা হয়, ফ্লাইটের বিলম্ব, বাতিল বা সময়সূচিতে পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের এসএমএস, ফোনকল, ই-মেইল, এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দ্রুত জানাতে হবে। ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত না করে যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসতে বলা যাবে না। ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা অভিবাসন-সংক্রান্ত সহায়তার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় সৌদি দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিতে হবে। এসব কাজ সমন্বয় করার জন্য প্রতিটি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দায়িত্বশীল একজন ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। ওই কর্মকর্তার নাম, পদবি, মোবাইল নাম্বার ও ইমেইল ঠিকানা দ্রুত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের পদক্ষেপ ও সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগ জানতে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি তিনি। এমনকি এসএমএস পাঠালেও দেননি জবাব।



