শুভ মহালয়া আজ
- চণ্ডীপাঠে দেবীপক্ষের সূচনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, শিশিরভেজা ভোরে কাশফুলের দোলা, আর চারদিক থেকে ভেসে আসা চণ্ডীপাঠের সুর। প্রকৃতির এমন স্নিগ্ধ আবহে বাঙালি হিন্দুদের মনে বেজে ওঠে দেবীদুর্গার আগমনী বার্তা। মহালয়ার ভোরে একদিকে তর্পণের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় প্রয়াত পূর্বপুরুষদের, অন্যদিকে চণ্ডীপাঠে আবাহন করা হয় দেবীদুর্গাকে। মহালয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয় দুর্গাপূজার প্রতীক্ষার দিন গণনা।
মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হলেও দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে ষষ্ঠীপূজার মাধ্যমে। আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের উৎসব।
আজ শনিবার মহালয়া উপলক্ষে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দির ও উপাসনালয়ে আয়োজন করা হয়েছে চণ্ডীপাঠ, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ, ঘট স্থাপন, বিশেষ পূজা, আগমনী সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে এসব ধর্মীয় আয়োজনে অংশ নেবেন ভক্তরা।
হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়া পিতৃপক্ষের শেষ তিথি এবং দেবীপক্ষের সূচনালগ্ন। পিতৃপক্ষে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাদের আত্মার শান্তি কামনায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। মহালয়ার ভোরে জল ও তিল নিবেদনের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করার রীতি প্রচলিত। অনেকেই নদী বা জলাশয়ের তীরে মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে এই আচার পালন করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রয়াত স্বজনদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি পারিবারিক স্মৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে আত্মিক বন্ধনও স্মরণ করেন তারা।
মহালয়ার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ চণ্ডীপাঠ। দেবীমাহাত্ম্য বা চণ্ডীতে বর্ণিত কাহিনিতে দেবীদুর্গার আবির্ভাব, অসুরবিনাশ এবং ধর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা উঠে এসেছে। মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীর মাহাত্ম্য স্মরণ করা হয়। আগমনী সংগীতেও ফুটে ওঠে দেবীকে ঘিরে ভক্তদের আবেগ ও অপেক্ষা।
পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিবসহ দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে আবির্ভূত হন দেবীদুর্গা। দেবতাদের দেওয়া বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সিংহবাহিনী দেবী মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর মহিষাসুরকে বধ করে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দেন তিনি। এই পৌরাণিক কাহিনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয় এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
মহালয়া উপলক্ষে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে চণ্ডীপাঠ, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তিল-তর্পণ, ঘট স্থাপন ও বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি থাকবে আগমনী সংগীত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুবাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন জানিয়েছেন, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের মহালয়া অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এদিকে রাজধানীর রমনা কালীমন্দিরেও ভোরে মহালয়া উদযাপনের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্দির পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মিন্টু বসু।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পাশাপাশি ঢাকায় রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, স্বামীবাগের লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দির, রামসীতা মন্দির এবং জয়কালী মন্দিরসহ রাজধানীর বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, চণ্ডীপূজা ও বিশেষ পূজার মধ্য দিয়ে মহালয়া পালনের আয়োজন রয়েছে।
এদিকে পূজা উপলক্ষে ১৬৮টি পূজামণ্ডপকে মোট ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরকে আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে ১০ লাখ টাকা। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ সনাতন পার্টি আয়োজিত জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলন, মহালয়া উদযাপন ও বস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর জানিয়েছেন, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। উৎসব সামনে রেখে মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।



