তৈরি হয়েছিল পদত্যাগপত্রের খসড়া, খবর ভিত্তিহীন বললেন ইশরাক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিতর্কের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ডেকে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রবিবার সাভারে নির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করে সচিবালয়ে এসেই ইশরাককে ডাকেন প্রধানমন্ত্রী। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তার উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চান তিনি। সন্ধ্যার পর খবর ছড়িয়ে পড়ে, ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এ খবরকে ‘বানোয়াট’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছেন প্রতিমন্ত্রী নিজেই।
গতকাল রাত ১২টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র আগামীর সময়কে জানিয়েছে, গেন্ডারিয়ার ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশ ক্ষুব্ধ। সাভারে কর্মসূচি শেষে ইশরাককে ডেকে তিনি ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান। এ সময় তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় বলেও দাবি সূত্রটির। এজন্য পদত্যাগপত্রের একটি খসড়াও তৈরি করা হয়। এরপর কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। বিকালে মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরু হলে প্রথমে ইশরাককে দেখা যায়নি। কিছু সময় পর তিনি বৈঠকে যোগ দেন।
প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ইশরাককে ডেকে কথা বলার বিষয়টি সত্য। তবে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমন তথ্য তাদের জানা নেই।
অন্যদিকে, পদত্যাগের নির্দেশের খবরের সত্যতা জানতে বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মন্ত্রিসভার এক সদস্য আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কারও কোনো অনিয়ম-অপকর্মের দায় নেবেন না। তিনি এর আগেও সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়ে জিরো টলারেন্স নীতি দেখিয়েছেন। ইশরাকের ঘটনায়ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়েছেন।’
‘পদত্যাগের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি’
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ বা তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবরকে সম্পূর্ণ অসত্য, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন প্রতিমন্ত্রী নিজেই।
এক বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাকে পদত্যাগের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তার পদত্যাগের প্রশ্নও ওঠে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে একটি মহল এ ধরনের মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পদত্যাগ নিয়ে এ ধরনের খবর প্রচারকে বেআইনি ও সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
গেন্ডারিয়ায় অস্ত্র প্রদর্শন ঘিরে বিতর্ক
গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাকের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। মাদক নির্মূলে তার উদ্যোগকে কেউ কেউ ইতিবাচকভাবে দেখলেও অস্ত্র প্রদর্শন, পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় এবং আইন প্রয়োগে জনপ্রতিনিধির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার দাবি করেছেন ইশরাক। ঘটনাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ইশরাক দাবি করেছেন, মাদকবিরোধী কর্মসূচি চলাকালে ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি তাদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। হামলার আশঙ্কায় তিনি আত্মরক্ষার্থে নিজের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের উপস্থিতিতে অভিযান চালিয়ে চার-পাঁচটি মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার এবং ছয়জনকে আটক করা হয়। ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত করতে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী, বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রদর্শনীবাজি বা হয়রানি করা নিষিদ্ধ। অস্ত্র আইন, ১৮৭৮-এর ১৩ ও ১৪ ধারায় লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী অস্ত্র বহন ও নিজের দখলে রাখার বিধান রয়েছে। শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ২১ ধারায় শাস্তির বিধান আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বললেন, মাদক নির্মূলে জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে তাদের নিজ উদ্যোগে পুলিশি অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা নেই। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে পারেন। তার মতে, এ ঘটনায় অস্ত্রের লাইসেন্স ও ব্যবহারের পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে দেওয়া হয়েছে। অস্ত্রের লাইসেন্স, ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা হবে।
ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা জানিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রী অভিযান সম্পর্কে আগে থেকে পুলিশকে অবহিত করেননি। পুলিশ পরে বিষয়টি জানতে পারে।
ইশরাকের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে তাকে গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করতে দেখা যায়। এ সময় তার পাশ থেকে একজনকে ‘একেবারে গুলি করে দেব’ বলতে শোনা যায়। সঙ্গে থাকা একজন দেহরক্ষীকে এক তরুণকে লাথি মারতেও দেখা যায়।
বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
বিএনপির একাধিক নেতা আগামীর সময়কে বলেছেন, মাদক দমনে জনপ্রতিনিধিদের প্রশাসনকে সহযোগিতা করা উচিত। তবে অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার কারণে উদ্যোগটি বিতর্কিত হয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জানিয়েছেন, এ ধরনের আচরণ জনমনে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের আহ্বান জানান।



