এবং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমি পাবলিক বাসে যাতায়াত করি। পাবলিক বাস একটি আজব জায়গা। কিছুদিন আগে খিলগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার যাওয়ার জন্য লাব্বাইকে উঠেছিলাম। প্রথমে ভাড়া নিয়ে যাত্রী-হেলপার একদফা হয়ে গেল। পরে মৌচাক থেকে নতুন যাত্রী ওঠায় বসা নিয়ে দুই যাত্রীর মধ্যে আরেক দফা শুরু হলো। এরপর মগবাজার সিগন্যাল— টানা ২০ মিনিট। প্রচণ্ড গরম। আর এত গরমে যাত্রীর মাথা ঠান্ডা থাকে কী করে? শুরু হয়ে গেল রাজনীতি...
পাবলিক বাস কি শুধু যাত্রী বহন করে? না। সঙ্গে বহন করে মতামত, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি। পাবলিক বাসে উঠলেই মনে হয়, দেশের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সম্ভবত এটি! তর্কের শুরু খুব নিরীহভাবেই হয়। এই ধরুন— একজন বললেন, ‘ভাই, একটু সরে বসেন।’ অন্যজন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন, ‘সরে বসার জায়গা আছে? সরে বসা যাবে না। সিটই ছোট।’ ব্যস! শুরু হয়ে গেল অধিবেশন। দুই মিনিটের মধ্যে জানা যায়, কে কত বছর বাসে চড়ছেন, কার কত অভিজ্ঞতা, কার বাবা কী করতেন— সব। মাঝেমধ্যে আঞ্চলিক উচ্চারণের পাশাপাশি দু-একটি ইংরেজি শব্দ ছুড়তেও যেন কার্পণ্য করেন না তর্কবাজরা!
ভাড়া নিয়ে তর্ক হলে তো কথাই নেই। যাত্রী বলবেন, ‘ভাড়া বেশি রাখলে কেন?’ হেলপার বলবেন, ‘সবকিছুর দাম বাইড়া গেছে।’ যাত্রী পাল্টা বলবেন, ‘আমার বেতন তো বাড়ে নাই।’ এই যুক্তির পর অর্থনীতির যেকোনো অধ্যাপকও সম্ভবত চুপ করে যাবেন।
কখনো তর্ক এতটাই জমে ওঠে যে, আশপাশের যাত্রীরা বিনা টিকিটে নাটক দেখতে থাকেন। কেউ মুচকি হাসেন, কেউ ভিডিও করেন, কেউ আবার উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘ভাই, ছাইড়েন না! চালাইয়া যান।’ বাসের পেছনে বসাদের মধ্য থেকে কেউ আবার বলতে থাকেন— ‘নামা, নামা, দুইডারেই নামা।’ ঝগড়া দেখে নাকি হাসতে হয় না। মীমাংসার জন্য চেষ্টা করতে হয়। বলুন, এই ঝগড়া কি থামানো যায়?
তবে বিপদ হয়, যখন যুক্তির মজুদ শেষ হয়ে যায়। তখন মুখের ভাষা বদলে যায় হাতের ভাষায়। যে তর্ক শুরু হয়েছিল ‘ভাই’ দিয়ে, সেটি শেষ হয় ‘ধরেন তো’! অথবা ধুপধাপ কিছু শব্দ দিয়ে। দুজনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে বাসের বাকি যাত্রীরা হঠাৎ শান্তির দূত হয়ে ওঠেন— অনেকেই আগে ভিডিওটা ঠিকমতো করে নেন।
শেষ পর্যন্ত বাস থামে, যাত্রীরা নামে, তর্কও থামে। কিন্তু পরের বাসে আবার নতুন অধিবেশন বসে। কারণ পাবলিক বাসের গন্তব্য বদলায়, তর্কের বিষয় বদলায়; কিন্তু তর্ক করার জাতি বদলায় না।






