ব্যাঙের বুদ্ধি

অলংকরণ করেছেন রজত
ঘরে ফিরতে গিয়ে একদিন এক ব্যাঙ পড়ল ভীষণ বিপদে। কীভাবে সামলাল, সেই গল্প লিখেছেন আব্দুস সাত্তার সুমন
ছোট্ট একটি ব্যাঙ বালুময় পথ ধরে লাফাতে লাফাতে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ পেছনে পাতার মর্মর শব্দ শুনে সে ফিরে তাকাল। দেখতে পেল, একটি বড় সাপ তার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে।
ব্যাঙটি বুঝতে পারল, বিপদ আসন্ন। মুহূর্তের মধ্যে সে প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে শুরু করল। ছোট্ট ব্যাঙটি যত দ্রুত সামনে এগোচ্ছে, সাপটিও তত দ্রুত তার পিছু নিচ্ছে। কখনো ব্যাঙটি ডানদিকে সরে যাচ্ছে, কখনো বামদিকে। কিন্তু সাপ কোনোভাবেই তার পিছু ছাড়ছে না।
একসময় ব্যাঙটি বালুময় একটি খোলা জায়গায় এসে পৌঁছাল। পেছনে তাকিয়ে দেখল, সাপ অনেক কাছে চলে এসেছে। তার বুক ভয়ে ধড়ফড় করতে লাগল। হঠাৎ তার মাথায় একটি বুদ্ধি খেলে গেল।
ব্যাঙটি পালানো থামিয়ে বালুর ওপর একেবারে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। তার শরীরের রঙ বালুর সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেল, দূর থেকে তাকে একটি ছোট্ট পাথরের মতো মনে হচ্ছিল।
সাপটি সেখানে এসে পৌঁছাল। তার মনে হলো, ব্যাঙটি নিশ্চয়ই সামনে চলে গেছে। তাই সে থামল না, ওই ব্যাঙের পাশ দিয়েই এগিয়ে গেল।
কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ সাপটি থেমে গেল। তার মনে হলো, ব্যাঙটিকে তো আর দেখা যাচ্ছে না! সে পেছনে ফিরে তাকাল। এদিক-সেদিক খুঁজল। বালুর ওপর ভালো করে তাকাল। কিন্তু ছোট্ট ব্যাঙটির কোনো চিহ্ন পেল না।
সাপটি আবার সেই পথ ধরে ফিরে এলো। বালুর মধ্যে পাথরের মতো দেখতে একটি ছোট্ট বস্তুর পাশ দিয়ে গেলেও তার সন্দেহ হলো না। সে বুঝতেই পারল না, যেটিকে পাথর ভেবে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে, সেটিই সেই ছোট্ট ব্যাঙ!
অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর ব্যাঙটিকে না পেয়ে সাপটি হতাশ হয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
সাপ চোখের আড়াল হওয়ার পর ছোট্ট ব্যাঙ ধীরে ধীরে নড়ল। তারপর চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে জোরে লাফাতে লাফাতে নিরাপদ স্থানের দিকে ছুটে গেল।
একটু দূরেই ছিল তার ছোট্ট বাসা। সেখানে পাঁচটি ছোট্ট ছানা অপেক্ষা করছিল। মাকে না পেয়ে ওরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। দেখা পাওয়ামাত্রই ওদের একজন বলল, ‘মা, তুমি এত দেরি করলে কেন? আমরা ভেবেছিলাম, তুমি আর ফিরবে না!’
আরেকটি ছানা মায়ের কাছে এসে জড়ো হয়ে বলল, ‘মা, তোমার গায়ে এত বালু কেন?’
ছোট্ট ব্যাঙটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর তার পাঁচ ছানাকে কাছে ডেকে বলল, ‘আজ আমি বড় বিপদ থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছি।’
পাঁচটি ছানা অবাক হয়ে একসঙ্গে বলে উঠল, ‘কী হয়েছিল, মা?’
ব্যাঙটি সাপের সঙ্গে দেখা হওয়ার ঘটনা ছানাদের শোনাল। কীভাবে সাপ তাকে তাড়া করেছিল, কীভাবে সে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়েছিল এবং শেষে বালুর সঙ্গে মিশে পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে সাপটিকে ফাঁকি দিয়েছিল— সব খুলে বলল।
ছানাগুলো মায়ের কথা মন দিয়ে শুনল। তারপর ব্যাঙটি বলল, ‘মনে রাখবে, বিপদ দেখলে সবসময় শুধু ভয়ে ছুটতে নেই। আগে বুঝতে হবে, কোথায় লুকালে নিরাপদ থাকা যায় এবং কীভাবে নিজের চারপাশকে কাজে লাগানো যায়।’
ছানারা মায়ের কথা মনে রাখল। পরদিন ছোট্ট ব্যাঙটি জলাভূমির অন্য ব্যাঙগুলোকেও ডেকে বলল, ‘সাবধান! আশপাশে সাপ ঘোরাফেরা করছে। বিপদে পড়লে কেউ ঘাবড়ে যেও না। নিজের চারপাশের পরিবেশ খেয়াল করবে। কখনো গাছপালা, কখনো গর্ত, কখনো ঘাস কিংবা বালু— পরিস্থিতি বুঝে নিরাপদ আশ্রয় নিতে হবে।’
অন্য ব্যাঙগুলো অবাক হয়ে তার কথা শুনল। ওরা বুঝতে পারল, ছোট্ট হলেও এই ব্যাঙের অনেক সাহস আর দারুণ বুদ্ধি।



