অনেক খেলায় আলো ছড়ানো তনিমা

গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃবিভাগ নারী ফুটবল টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় তনিমা আক্তার
মাঠে টানটান উত্তেজনা। গণবিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার প্রতিপক্ষ সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগ। তারা আগের বছরের চ্যাম্পিয়ন। নির্ধারিত সময়ে দুই দলের লড়াই শেষ ১-১ গোলে। বাংলার হয়ে গোল করেন তনিমা আক্তার। এরপর হলো টাইব্রেকার। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ালেন তিনি। টাইব্রেকারে একটি শট ঠেকিয়ে ও একটি গোল করে দলকে এনে দিলেন শিরোপা। ৩-২ গোলে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো আন্তঃবিভাগ নারী ফুটবল প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলা বিভাগ। ফাইনাল ও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার দক্ষিণ গাজীরচট এলাকার মেয়ে তনিমা। তিনি তৃতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। ৩৫ নম্বর জার্সি পরে মিডফিল্ডে খেলেন। দলের প্রয়োজনে গোলরক্ষকও হন।
গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃবিভাগীয় নারী ফুটবল প্রতিযোগিতা-২০২৬-এর আগে বাংলা বিভাগের মেয়েরা প্রায় এক মাস মাঠে অনুশীলন করেছেন। তবে ইনজুরির কারণে সতীর্থদের সঙ্গে মাত্র সাত দিন অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছিলেন তনিমা। তারপরও নিজের অভিজ্ঞতা, খেলার কৌশল কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে উজ্জ্বল ছিলেন তিনি। প্রথম ম্যাচে একটি, দ্বিতীয় ম্যাচে দুটি এবং ফাইনালে একটি গোল করেছেন। দ্বিতীয় ম্যাচে একটি অ্যাসিস্টও ছিল তার।
ছোটবেলায় মেজ ভাইকে খেলাধুলা করতে দেখে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ জন্মায় তনিমার। ভাইবোনেরা বাড়িতে খেলাধুলা করতেন। সে আগ্রহই একসময় তাকে নিয়ে যায় প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের মাঠে। স্কুলজীবনে আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় খেলার মাধ্যমে খেলোয়াড়ি জীবনের শুরু। গাজীরচট আকবর মণ্ডল উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের ক্রীড়া শিক্ষক রেজাউল হক উজ্জ্বলের হাত ধরে ফুটবল খেলার হাতেখড়ি তার।
২০২৫ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত খো খো বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি। ২০২৬ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত নারী বেসবল প্রতিযোগিতায়ও খেলার সুযোগ পেয়েছেন
মেয়েদের খেলাধুলা নিয়ে সমাজের একাংশের নেতিবাচক মনোভাব উল্লেখ করে তনিমা আক্তার জানালেন, মাঠে ছেলেদের সামনে হাফপ্যান্ট পরে খেলতে নামা কিংবা মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে তাকে নানা কথা শুনতে হয়েছে। তবে পরিবারের কাছ থেকে বাধার মুখে পড়তে হয়নি; বরং ছোট বোন, মেজ ভাই ও শিক্ষকের অনুপ্রেরণা তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। তনিমার এক শিক্ষক একদিন বলেছিলেন, ‘নিজের লক্ষ্য ঠিক রাখতে হলে অন্যের কথায় কান দেওয়া যাবে না।’ সেই কথা আজও মনে রেখেছেন তিনি। সেটিই তার এগিয়ে চলার মূলমন্ত্র।
খেলোয়াড় কোটায় গণবিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন তনিমা। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ফুটবলের পাশাপাশি হ্যান্ডবলও খেলেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দলের হয়ে ক্রিকেট, রাগবি, খো খো ও বেসবলে অংশ নিয়েছেন। খেলাধুলার সুবাদে দেশের বাইরে দুবার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। ২০২৫ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত খো খো বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি। ২০২৬ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত নারী বেসবল প্রতিযোগিতায়ও খেলার সুযোগ পেয়েছেন। বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তার ক্রীড়াজীবনকে করেছে সমৃদ্ধ।
খেলাধুলার অনুশীলন, প্রতিযোগিতা এবং নিয়মিত অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের মধ্যে সময় ভাগ করে নিতে হয় তনিমাকে। সুযোগ পেলেই পড়তে বসেন। শিক্ষকরা তাকে সহযোগিতা করেন, বিশেষ করে অ্যাসাইনমেন্ট ও পড়াশোনার কাজে সহপাঠী পারিসার সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন তিনি। জানিয়েছেন, বিভাগীয় প্রধান ড. এ এস এম দেলোয়ার হুসাইনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে খেলাধুলায় উৎসাহ দেন। সহপাঠীদের সহযোগিতাও তার এগিয়ে চলার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তার মতে, পড়াশোনা ও খেলাধুলা একসঙ্গে চালিয়ে যেতে কিছুটা কষ্ট হলেও দুটিই ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য বর্তমানে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখেন তিনি। তবে মেয়েদের খেলাধুলার পথে দুর্নীতিসহ নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়
কর্তৃপক্ষের কাছে তার প্রত্যাশা,
আন্তঃবিভাগীয় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো হবে। এতে শিক্ষার্থীরা
নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাবেন, পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতিও বাড়বে। নতুন নারী শিক্ষার্থীদের
উদ্দেশে তনিমা বললেন, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় যুক্ত থাকা উচিত। খেলাধুলা
শুধু শারীরিক সুস্থতাই নিশ্চিত করে না, মানসিক
প্রশান্তিও এনে দেয় এবং
শিক্ষক-সহপাঠীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য
করে।



