ব্যর্থতার ভেতরেই সম্ভাবনার বীজ

পরিবেশের নানা সমস্যা, বিশেষ করে শিল্পবর্জ্য ও দূষিত পানি পরিশোধনের কার্যকর পদ্ধতি খুঁজে বের করা অধ্যাপক ড. শাহিনুর ইসলামের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্যপানি যথাযথভাবে পরিশোধন না হলে তা নদী, মাটি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এই দূষণ কমাতে কীভাবে আরও কার্যকর প্রযুক্তি তৈরি করা যায়, বিদ্যমান পদ্ধতির কীভাবে উন্নতি ঘটানো সম্ভব— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তিনি। তার গবেষণার লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে এমন সমাধানের পথ তৈরি করা, যা পরিবেশ সুরক্ষায় কাজে লাগতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ২০০৫ সালে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি উচ্চতর গবেষণার জন্য ২০০৯ সালে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টায় পাড়ি জমান। সেখানে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। এই সময়ের অভিজ্ঞতা তার গবেষণার জগৎকে আরও প্রসারিত করে। পরিবেশের জটিল সমস্যাগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা এবং সেগুলোর কার্যকর সমাধান খোঁজার প্রতি তার আগ্রহ আরও গভীর হয়।
ড. শাহিনুর ইসলামের গবেষণার পরিসর বেশ বিস্তৃত। বর্জ্যপানি পরিশোধনের পাশাপাশি তিনি কাজ করেছেন ফ্লুইডাইজড-বেড বায়োফিল্ম রিঅ্যাক্টর, গ্র্যানুলার অ্যাকটিভেটেড কার্বন, ফটোক্যাটালাইসিস ও ন্যানোকম্পোজিটের মতো বিষয় নিয়ে। এসব প্রযুক্তি দূষক অপসারণ এবং পানি পরিশোধনের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার সম্ভাবনা তৈরি করে। তার গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র মাইক্রোপ্লাস্টিক। অতিক্ষুদ্র এই প্লাস্টিক কণা পরিবেশে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, কী ধরনের প্রভাব ফেলে এবং কী উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়— এসব প্রশ্ন এখন বিজ্ঞানীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত জারণপ্রক্রিয়া ও নতুন উপকরণের ব্যবহার নিয়েও গবেষণা পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অধ্যাপক ড. শাহিনুর টানা তিনবার বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তার গবেষণা-দর্শনের মূল কথা হলো— প্রকৃতির প্রতিটি সংকেত মন দিয়ে পড়তে, ভুল থেকে শিখতে এবং প্রশ্ন করার সাহস ধরে রাখতে হবে।
বিজ্ঞানের পথ সব সময় সরল নয়; অনিশ্চয়তা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর নতুন করে শুরু করার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায় অনুসন্ধান। সেই পথেই অধ্যাপক ড. শাহিনুর ইসলামের নিরন্তর চেষ্টা— ব্যর্থতার ভেতর থেকে সম্ভাবনা খুঁজে বের করা এবং গবেষণাকে পরিবেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো।



