রাবি সিনেট
মেয়াদ এক বছর, শপথ হয়নি ১০ মাসেও
- এখনো ডাকা হয়নি সিনেটের অধিবেশন
- ক্যাম্পাস ছেড়েছেন এক প্রতিনিধি, পদত্যাগের ভাবনা অন্যদের

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিনেট। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট অনুমোদন, নতুন বিভাগ চালু, আইন সংশোধন থেকে শুরু করে উপাচার্য নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক দায়িত্ব এই পরিষদের। অথচ দীর্ঘদিন ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম। গত বছরের ১৮ অক্টোবর হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন। নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভোটে পাঁচজন সিনেট সদস্য নির্বাচিত হলেও প্রায় ১০ মাসেও অনুষ্ঠিত হয়নি সিনেটের কোনো অধিবেশন। এমনকি নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা এখনো সুযোগ পাননি আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেওয়ার।
ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পরও নীতিনির্ধারণী ফোরামে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না তারা। এতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা। এরই মধ্যে আকিল বিন তালেব নামে নির্বাচিত এক প্রতিনিধি চলে গেছেন ক্যাম্পাস ছেড়ে। আরও কয়েকজন প্রতিনিধি পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ১০৪ সদস্যের সিনেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বপূর্ণ পরিষদ। উপাচার্য পদাধিকারবলে এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া দুই উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, ৩৩ জন নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি, ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি, সরকার ও আচার্য মনোনীত সদস্য, সংসদ সদস্য, কলেজ প্রতিনিধি এবং শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি থাকেন সিনেটের সদস্য হিসেবে।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অভিযোগ, নির্বাচনের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া বা শপথ গ্রহণে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। একই সঙ্গে কার্যক্রমও শুরু হয়নি সিনেটের। রাকসুর ভিপি ও নির্বাচিত সিনেট সদস্য মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলছিলেন, ‘সিনেট ছাত্র প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে প্রশাসন তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া বা কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের আয়োজন করেনি। এমনকি সিনেটের কার্যক্রম সচল করার ব্যাপারেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার অভিযোগ তুলে মোস্তাকুরের ভাষ্য, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় একক প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। সিনেট কার্যকর থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত হতো।
মোস্তাকুর রহমানের দাবি, বর্তমানে ভিসি নিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা শক্তিশালী সিনেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। অতীতে ক্ষমতাসীন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।
রাকসুর জিএস ও সিনেট সদস্য সালাউদ্দিন আম্মার বললেন, ‘গত প্রশাসনের সময় সিনেট কার্যকর করার লক্ষ্যে আমরা একটি নির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তবে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরো প্রক্রিয়াটি কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায়।’
সিনেট কার্যকর করতে কিছু আইনি শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ সদস্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয় উল্লেখ করে আম্মার জানালেন, বর্তমানে অনেক সিনেট সদস্য মারা গেছেন। আবার অনেকেই এখনো যে তারা সিনেট সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন— অবগত নন সে বিষয়ে। সিনেট কার্যকর করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সিনেটের আরেক নির্বাচিত সদস্য আকিল বিন তালেব প্রশাসনের অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। তার ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের ইশতেহারের ভিত্তিতে তাদের পাশে থেকে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার আট মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের ধীরগতির কারণে গ্রহণ করতে পারেননি শপথ।
‘শিক্ষার্থীদের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কোনো সুযোগই পাচ্ছি না। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার দায়ে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে’— যোগ করলেন আকিল। ক্যাম্পাস ছাড়ার বিষয়ে তার অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট সদস্যদের কাজ করার জন্য ন্যূনতম কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। এমনকি বসার মতো করা হয়নি নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থাও। দীর্ঘদিন কোনো কার্যক্রম না থাকায় হলের আসন ছেড়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন তিনি।
সিনেট কার্যকর করার বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পাওয়া যায়নি বলে জানালেন আরেক নির্বাচিত সদস্য ফাহিম রেজা। বললেন, ‘সিনেটের বিষয়টি নিয়ে আমরা বারবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। কিন্তু তারা এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। প্রশাসন আমাদের জানিয়েছে, কোরাম পূর্ণ না হওয়ায় তারা বিষয়টি নিয়ে এগোতে পারছেন না। এটি অত্যন্ত হতাশাজনক।’
তবে সিনেট কার্যকর করার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলছিলেন, ‘সিনেটের ব্যাপারে আমরা সত্যি আগ্রহী। কিন্তু আমরা টেকনিক্যাল সমস্যার মধ্যে আছি। ফ্যাসিবাদীদের কিছু সদস্য সিনেট সদস্য হিসেবে আছেন। তাদের নিয়ে আমরা উভয়সংকটে আছি। তাদের ডাকলে আসবে, আবার না ডাকলেও সিনেট হচ্ছে না। আমরা অতিদ্রুত বিষয়টি সুরাহা করে সিনেটের জন্য একটা ব্যবস্থা করব।’
শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত পাঁচ প্রতিনিধি দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পাওয়ায় সিনেটের কার্যকারিতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হিসেবে সিনেট সক্রিয় না থাকলে দুর্বল হয়ে পড়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ, জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্বের কাঠামো।






